আর আই রফিক :
সকাল নটা। বাসার সকলের খাওয়া শেষ। গৃহকর্তা মনির সাহেব অফিসে চলে গেছেন। নয় বছর বয়সী কাজের মেয়ে ফুলে ওয়াশরুমে ময়লা থালা বাসনগুলো ধুয়ে নিচ্ছে। পেটে তার প্রচণ্ড ক্ষিদে। এজন্য দ্রুততার শেষ নেই। প্লেট বাটিগুলো ধোয়া শেষ করলে তাকেও খেতে দেয়া হবে।
এসময় গৃহকর্ত্রী নাজমা ওয়াশরুমে গিয়ে আচমকাই তার হাতে ধরে ফেললো। কিছু বুঝতে না পেয়ে ফুলে তার দিকে বিস্ময়ের সাথে তাকালো। রক্তচক্ষু দেখে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে। এর মাঝেই নাজমা বলে উঠলো -- এই ছুড়ী বল্, টাকা কই রেখেছিস্ ?
ভয়ে ফুলের গলা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ। জিহ্বায় ঠোট ভিজিয়ে কোনরূপে বললো -- কিয়ের টেহা ?
নাজমা ওর গালে শক্ত একটা চিমটি দিয়ে ভেঙচি কেটে উঠলো -- কিয়ের টেহা ? আজকে দেখাচ্ছি মজা। ঘরে কিছু দেখলেই লোভ সামলাতে পারো না। আজ লোভটা বের করবো।
কথাগুলো বলতে বলতে ওকে টেনে মূল কক্ষে নিয়ে গেলো। সেখানে একহাতে ফুলেকে ধরে রেখে অন্য হাতে ড্রয়ার টেনে একটা সেলাইয়ের সুঁচ বের করলো। এতেই ফুলে বুঝে গেলো, ওটা দিয়ে কি করা হবে। ক'দিন আগেও মেঝে মুছতে দেরী হওয়ার অপরাধে এই সুঁচটা তার নখের নীচে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তিন চার দিন সে হাতের ব্যথায় কঁকিয়েছে। ঐ হাতে কিছু ধরতে পারেনি। আজ সূঁচটা দেখেই ভয়ে পাগলের মত বলতে লাগলো -- আফা, আমার মরা বাপের কসম কইরা কইতাছি, আমি টেহা দেহি (দেখি) নাই। আমি টেহা ন্যা থাকলে আমার বাপের কব্বরে আগুন জ্বলবো।
ওর কথা শুনার অবসর কিন্তু নাজমার নেই। সে ফুলের হাতটা শক্ত করে ধরে বললো -- পাঁচশ টাকার নোটটা বিছানার উপরে রেখে মাত্র বেরিয়ে গেছি। রুমে আর কেউ এলো না। তুই না নিলে টাকাটা কি জ্বীনে নিয়ে গেছে ? পাজি মেয়ে। এখনো বের কর্ টাকা।
ফুলে ভয়ে বলে উঠলো -- তাইলে আমার বেতনের টেহা থাইক্কা কাইট্যা দিয়েন, আফা।
"এই তো বের হচ্ছে " কথাটা উচ্চারণ করেই নাজমা ওর মধ্যমা আঙ্গুলের নখের নীচে সুঁচের অনেকটা অংশ ঢুকিয়ে দিলো।
চিৎকার করতে করতে ফুলে হাতটা ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পারছে না। নাজমা হাতটা ধরে রেখেই বললো -- যতক্ষণ পর্যন্ত টাকা বের না করবি, ততক্ষণ সুইটা এখানেই থাকবে। বের করবো না। টাকাও বের হবে, সুইও বের করবো।
প্রায় দেড় মিনিট কেটে গেছে। ছাড়া না পেয়ে ব্যথায় অস্থির হয়ে ফুলে কেঁদে কেঁদে বলে উঠলো -- আমারে ছাইড়া দেন, আফা। টেহা আমি আইন্যা দিতাছি।
এবার নাজমা খুশী হলো। বললো -- এই তো, টাকা বের হচ্ছে।
সুঁচটা বের করে নিয়ে আরো বললো -- কিভাবে চোরের মুখ খুলাতে হয়, সেটা আমার জানা আছে। যা, তারাতাড়ি টাকা বের করে আন্। দুই মিনিট টাইম। নইলে তো বুঝতেই পারিস্।
ফুলের নখের নীচ থেকে কয়েক ফোটা রক্ত ঝরে পড়লো। ব্যথায় সে হাতটাকে ছুড়াছুড়ি করছে। এর মাঝে নাজমা ধমকে উঠলো -- দাঁড়িয়ে আছিস্ কেন ? টাকা বের করে আন্। নাইলে এবার ওই হাতে ঢুকাবো।
ফুলে রুম থেকে বেরিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। সেখানে শুধু শুধু সময় ক্ষেপণ করছে। হয়ত মনে মনে বাঁচার একটা পথ খুঁজে চলছে।
এ সময় মনির সাহেব বাসায় ফিরে এলেন। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটা ফাইল ভুলে তিনি বাসায় রেখে গিয়েছিলেন। সেটা নিতেই ফিরে আসা।
স্বামীকে দেখে নাজমা বলে উঠলো -- দেখলে, ফুলেটা কত বড় চোরা ? পাঁচশ টাকার নোটটা আমি বিছানার উপরে রেখে মাত্র বাইরে গেছি। এসে দেখি আর নাই। এমন চোরা মেয়েকে বাসায় কিভাবে রাখবো, বল ?
মনির সাহেব ধমকে উঠলেন -- ধ্যোৎ, মুখে যা আসছে তা-ই বলে বলে যাচ্ছো। শুধু শুধু ওকে দোষ দিচ্ছো কেন ? দোষ তো তোমার।
স্ত্রীকে জিজ্ঞেসের দৃষ্টিতে তাকাতে দেখে তিনি আরো বলতে লাগলেন -- এভাবে কেউ টাকা ফেলে রাখে না কি ? সকালে পাঁচশ টাকার একটা নোট বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে সেটা আমিই তুলে রেখেছি। আলমারীতে ঐ বাক্সটায় দেখোগে।
নাজমা তো হতবাক। সে বেরিয়ে ফুলেকে খুঁজতে লাগলো। ওয়াশরুমে গিয়ে দেখলো, ফুলে এক কোণায় দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে চোখের জল মুছছে। এবার তার উপস্থিতি টের পেয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে খোঁজ করার অভিনয়ে বললো -- টেহাডা আমি এইনো (এখানে) রাখছিলাম। অহন তো পাইতাছি না।
পরে পানি নিষ্কাশন পাইপের ছাকনিতে হাত দিয়ে বললো -- না কি এইহান (এখান) দিয়া পইড়াই গেলো ?
ওর মিথ্যা কথা আর অভিনয় দেখে নাজমার চোখেও অশ্রু এসে পড়ার উপক্রম। আবেগে সে ফুলেকে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলে উঠলো -- থাক্, আর খুঁজতে হবে না। আয়, ঘরে আয়। তুই তো এখনো কিছুই খাসনি্।
ফুলে কিন্তু তখনও বিষয়টার কিছুই বুঝতে পারেনি। তাই তার ভয়টাও মন থেকে দূর হতে চাইছে না।
লেখক : কবি ও উপন্যাসিক