রিয়াজুল হক :
বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই খবর থাকে। বিশেষ করে দূরপাল্লার দ্রুতগতির বাস দুর্ঘটনার খবর এখন যেন অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং দুঃখজনক এক দৈনন্দিন বাস্তবতা। একেকটি দুর্ঘটনা ঘটলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে বহু পরিবার স্বজনহারার বেদনা নিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। আর যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকে আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নানা পদক্ষেপের কথা বলা হয় যেমন, কঠোর ট্রাফিক আইন, অভিজ্ঞ চালক নিয়োগ, সড়কের মানোন্নয়ন, নজরদারি বাড়ানো ইত্যাদি। কিন্তু এক সহজ অথচ কার্যকর ব্যবস্থা আমাদের দেশের বাসগুলোতে এখনো গুরুত্ব পায়নি, সেটি হলো সিটবেল্ট।
দূরপাল্লার দ্রুতগতির বাস যখন দুর্ঘটনায় পতিত হয়, তখন মৃত্যুর প্রধান কারণ হয় মাথা ও বুকে প্রচণ্ড আঘাত লাগা। গবেষণায় দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রায় ৪০ শতাংশই মাথায় আঘাতের কারণে ঘটে। আর এ আঘাতের বড় একটি অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো যদি যাত্রীরা সিটবেল্ট বাঁধা থাকতেন।
বাস দুর্ঘটনায় প্রায়ই দেখা যায় ঘুমন্ত যাত্রীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। হঠাৎ ব্রেক কষা কিংবা ধাক্কা খাওয়ার সময় তাদের মাথা সামনে থাকা সিটে প্রচণ্ডভাবে আঘাত পায়। এই আঘাত যদি মাথা বা ঘাড়ে লাগে, তখনই মৃত্যু বা পক্ষাঘাত ঘটতে পারে। অথচ সিটবেল্ট যাত্রীকে স্থির অবস্থানে ধরে রাখে, ফলে সামনের সিটে ধাক্কা খাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
গাড়ি যখন অতিদ্রুত বেগে ছুটে, দুর্ঘটনা ঘটার মুহূর্তে যাত্রীর নিজের শরীরের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অনেক সময় কাঁচ ভেঙে বাইরে ছিটকে পড়ে যান, আবার কখনো সিট ছেড়ে ছিটকে গিয়ে লোহার দণ্ড বা অন্য কোনো ভারী বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খান। সিটবেল্ট থাকলে অন্তত নিজের সিটে নিরাপদে থাকা যায়, ফলে প্রাণহানির ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
বাস উল্টে গেলে বা কয়েকবার গড়িয়ে পড়লে যাত্রীদের শরীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন সবাই একে অপরের ওপর পড়ে গিয়ে আরও বড় ক্ষতি ডেকে আনে। অথচ সিটবেল্ট থাকলে প্রত্যেকেই নিজ নিজ সিটে আটকে থাকতে পারত, ফলে ভেতরে বিশৃঙ্খলা ও আঘাতের মাত্রা অনেকটাই কমে আসত।
ড্রাইভারের আসনেও যদি সিটবেল্ট থাকে, তবে মোড় নেয়া বা হঠাৎ ব্রেক করার সময় চালকের জন্য সিটে স্থিতিশীল থাকা সহজ হয়। এতে বাসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনাও কমে যায়। অর্থাৎ যাত্রীদের পাশাপাশি চালকের সুরক্ষা এবং দক্ষ নিয়ন্ত্রণেও সিটবেল্ট জরুরি ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের দূরপাল্লার বাস এখনো সিটবেল্টবিহীন। যাত্রী সিটে তো বটেই, ড্রাইভারের আসনেও অনেক সময় সিটবেল্ট থাকে না। কেউ কেউ যুক্ত দেখান, যাত্রীরা সিটবেল্ট ব্যবহার করতে চাইবেন না, যা অত্যন্ত খোঁড়া যুক্তি। আবার কেউ কেউ বলেন, এতে খরচ বাড়বে। অথচ এই সামান্য খরচের বিনিময়ে যে শত শত জীবন বাঁচতে পারে, তা তারা ভুলে যান কিংবা এড়িয়ে যান। এছাড়া আইনগতভাবেও আমাদের দেশে বাসে সিটবেল্টের বাধ্যবাধকতা নেই। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস কিংবা ট্রাকচালকদের জন্য সিটবেল্ট বাধ্যতামূলক হলেও দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম প্রয়োগ হয় না। এটি নিঃসন্দেহে এক বড় ঘাটতি।
এরকম পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দূরপাল্লার সব বাসে সিটবেল্ট বাধ্যতামূলক করার জন্য আইন করতে হবে। যাত্রী এবং চালক উভয়ের জন্যই এটি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বাস আমদানির সময় সিটবেল্ট সংযোজন বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিদ্যমান বাসগুলোতেও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সিটবেল্ট বসানোর নির্দেশ দিতে হবে। টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদপত্র, সবখানে প্রচার চালিয়ে যাত্রীদের বোঝাতে হবে যে, সিটবেল্ট জীবন বাঁচায়। যেভাবে হেলমেট না পরলে বাইকচালককে জরিমানা করা হয়, সেভাবে বাসে সিটবেল্ট না বাঁধলে জরিমানার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রতিবাদে স্লোগান তোলা, মানববন্ধন করা কিংবা ক্ষতিপূরণ নিয়ে আদালতে যাওয়া, এসবই পরবর্তী প্রতিক্রিয়া। অথচ দুর্ঘটনার ক্ষতি ঠেকাতে সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সিটবেল্ট সেই প্রতিরোধের অন্যতম সহজ, সস্তা এবং কার্যকর উপায়। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার মিছিল থামাতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। দূরপাল্লার প্রতিটি বাসে সিটবেল্ট বাধ্যতামূলক করা এখন আর বিলম্ব করার বিষয় নয়।
জীবন একটাই, এটা হারানোর পর ফিরিয়ে আনা যায় না। একটি ছোট্ট সিটবেল্ট হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে শত শত প্রাণ, অগণিত পরিবারকে দীর্ঘশ্বাস ও অশ্রুধারার বোঝা থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই এখনই সময়, দূরপাল্লার বাসে সিটবেল্ট বাধ্যতামূলক করা হোক।
লেখক: রিয়াজুল হক, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।