এ,কে,এম,নূরুল হক :
পুষ্টিমানের দিক দিয়ে মলা মাছ একটি আদর্শ মাছ।আমাদের দেশের অঞ্চল ভেদে মলা মাছ বিভিন্ন নামে পরিচিত। তার মধ্যে ময়া মোয়া, মকা, মৌকা, মুদে, মোলঙ্গী, মৌরালা, মলেন্দা ও মৌচি নামে পরিচিত। মলা মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Amblypharyngodon microlepis. এতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন এ,ডি,ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম,ফসফরাস, আয়রন সহ অনেক খনিজ পদার্থ থাকে। ১০০ গ্রাম মলা মাছে আছে ক্যালসিয়াম ৮৫৩ মি:গ্রা:,আয়রন ৫.৭ মি:গ্রা:,ভিটামিন এ রয়েছে ২০০০ ইউনিট।মানবদেহে বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন 'এ' একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।
মানব দেহে বৃদ্ধির জন্য মানব শরীরের ইমিউন সিস্টেম উন্নত করার জন্য,মস্তিষ্কের গঠনকে সমৃদ্ধ করার জন্য ভিটামিন 'এ' এর গুরুত্ব অপরিসীম। গবেষণায় দেখা গেছে মলা মাছে উচ্চমাত্রার একাধিক অনুপুষ্টি ও ফ্যাটি এসিড রয়েছে যা শিশুদের মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশের জন্য অনন্য ভুমিকা রাখতে সম্ভব।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে শিশুদের জীবনে প্রথম এক হাজার দিন সকল কিছু বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়।এ সময় শিশু ও মায়েদের পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের জন্য জীবন গঠনকারী সব খাদ্যমান নিশ্চিত করতে পারে এই মলা মাছ।আমাদের দেশের একজন গবেষক পরীক্ষা করে দেখেছেন শিশুদের খাদ্য গ্রহনের শুরু থেকে এক হাজার দিন পর্যন্ত প্রতিদিন দুইটা করে মলা মাছ খেলে আর কোন বাড়তি ভিটামিনের প্রয়োজন নাই। ডেন মার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড.শকুন্তলা হরাকশিং থিলষ্টেট বাংলাদেশের মলা মাছের পুষ্টিগুন গবেষণা করে জাতিসংঘের নোবেল পুরষ্কার খ্যাত FAO কৃষি পুরষ্কার পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা মলা মাছের পুষ্টি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন এক কেজি মলা মাছে যে পরিমান ভিটামিন 'এ' রয়েছে তা ১০০ কেজি সিলভার কার্প মাছের ভিটামিন 'এ' এর সমান।
মলা মাছ পানিতে খুবই শক্তিশালী অথচ ডাঙ্গায় তোলা মাত্রই কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যায়।বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের বিজ্ঞানীগন এই মলা মাছ নিয়ে অনেকদিন কাজ করেছেন।প্রাকৃতিক উৎস থেকে জীবন্ত মলা মাছ ধরে পুকুরে ছেড়ে দিয়ে পুকুরে প্রাকৃতিক ভাবে প্রজনন করে মলা মাছের চাষের পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছিল।কিন্তু এটাতে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল।
কেননা প্রাকৃতিক পরিবেশ তথা খাল বিল থেকে জীবন্ত মলা মাছ ধরে এনে পুকুরে এনে বাচানোই একটা কঠিন চ্যালেন্জের কাজ।সেজন্য প্রয়োজন হয় কৃত্রিম প্রজননের। কিন্তু এতো ছোট এবং সংবেদনশীল মাছকে প্রজনন করা এক মহা চ্যালেন্জের কাজ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন ড.আব্দুল ওয়াহাব মহোদয়ের সাথে ব্যাক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে আমার প্রতিষ্ঠানের সাথে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে। উনি মলা মাছের কৃত্রিম প্রজননের জন্য আমাকে বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন।
অবশেষে টানা তিন বছর নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ২০১৭ সালে মলা মাছের কৃত্রিম প্রজননের সফলতা পাওয়া যায়।২০১৮ থেকে বাংলাদেশে প্রথম বানিজ্যিক ভাবে " ব্রহ্মপুত্র ফিস সীড কমপ্লেক্স (হ্যাচারী)" থেকে নিয়মিত মলা মাছের কৃত্রিম প্রজনন করে সারা দেশে সম্প্রসারণ করে আসছে। সাফল্যের ধারাবাহিকতা ২০২২ সালে মলা মাছের কৃত্রিম প্রজননের জন্য স্বর্ণপদক লাভ করে।গবেষণা করে দেখা যায় মিশ্রভাবে কোন প্রকার বানানো খাবার ছাড়াই মলা মাছের চাষ করা যায়।খাবার হিসাবে পানিতে সবুজ শ্যাওলা বা ফাইটোপ্লাংটন খেয়ে মলা মাছ বড় হয়ে থাকে।
কার্প জাতীয় (রুই,মৃগেল কাতল) জাতীয়,পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, শি, টেংরা গুলশা, ইত্যাদি মাছের সাথে মিশ্রভাবে কোন প্রকার খাবার ছাড়াই শতাংশ প্রতি ৮/১০ কেজি পর্যন্ত মলা মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে।মলা মাছ চাষের জন্য প্রথমে পুকুরে নার্সারি করে তারপর অন্যন্যমাছ মজুদ করতে হয়।এরপর থেকে মজুদকৃত অন্যন্য মাছকে খাবার দিলে পানিতে যে সবুজ শ্যাওলা বা ফাইটোপ্লাংকটন উৎপন্ন হয় তা খেয়ে মলা মাছ বড় হয়ে যায়।পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে খাল বিল বা হাওড়ের মলা মাছের যে স্বাদ পাওয়া যায় পুকুরে চাষের মলা মাছেও একই স্বাদ পাওয়া যায় কেননা পুকুরেও মলা মাছ প্লাংকটন খায়, খালে বিলেও মলা মাছ প্লাংকটন খায়।পুকুরে মলা মাছ কোন বানানো বা কৃত্রিম খাবার খায় না।
উপরন্তু এভাবে মলা চাষ করলে পুকুরে পানির পরিবেশ ভালো রাখে।মলা মাছের বাজারজাত এর জন্য মলা ধরার আগে বরফ এনে রাখতে হবে।পুকুর থেকে মাছ ধরে সাথে সাথে বরফ দিয়ে বাজারজাত করতে হয়।বরফ ছাড়া বেশীক্ষণ রাখলে মলা মাছ সাদা হয়ে যায় ফলে বাজার মুল্য পাওয়া যায় না।মাছ বিক্রির সময় কিছু মলা মাছ পুকুরে রেখে দিলে পরে নিয়মিত ভাবে পুকুরে ডিম দিয়ে থাকে।ফলে আর কোন দিন মলার রেনু ছাড়তে হয় না।
লেখক : এ,কে,এম,নূরুল হক, রাষ্ট্রীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত মৎস্য খামারী