আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : রবিবার যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অবস্থান বজায় রাখলেও এবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার সরাসরি ও স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটনের পথ থেকে সরে এসে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে বৈধতা দিলেন। এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাজ্য বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড়াল, যদিও এতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।
স্টারমার তাঁর সরকারি এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতার মুখে আমরা শান্তির সম্ভাবনা ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের আশা বাঁচিয়ে রাখতে চাই। এর মানে হলো একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র।” তিনি আরও যোগ করেন, “শান্তির আশা ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে পুনর্জীবিত করার স্বার্থে আমি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছি যে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে।” এই ঘোষণাটি আকস্মিক ছিল না। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে লন্ডন পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিল যে, যদি ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে না আসে, গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবাহ না বাড়ায়, পশ্চিম তীর দখলের পরিকল্পনা থেকে সরে না দাঁড়ায় এবং একটি বাস্তবসম্মত শান্তি প্রক্রিয়ায় অঙ্গীকারবদ্ধ না হয়, তবে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে। সেই শর্ত পূরণ না হওয়াতেই রবিবারের পদক্ষেপটি বাস্তবায়িত হলো।
ফিলিস্তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন রামাল্লায় এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “এটি আমাদের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার দিকে আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে। এটি হয়তো আগামীকাল যুদ্ধ থামাবে না, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, যার ওপর ভিত্তি করে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারব।” তাঁর মতে, এক সপ্তাহে একাধিক রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ায় দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান রক্ষার পথে এটি এখন এক অপরিবর্তনীয় ধাপ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল এই সিদ্ধান্তকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই স্বীকৃতি আসলে হামাসকে পুরস্কৃত করা।” কিছু ইসরায়েলি মন্ত্রী একে অপ্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেছেন এবং দাবি করেছেন যে বাস্তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কেবলমাত্র সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। ওয়াশিংটনও এই সিদ্ধান্তে অখুশি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, এটি তাঁর ও কেয়ার স্টারমারের সাম্প্রতিক রাষ্ট্র সফরের সময়কার দুর্লভ মতভেদের একটি। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এই স্বীকৃতি অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় কোনো সহায়তা করবে না, বরং হামাসকে উৎসাহিত করবে। ব্রিটিশ ঘোষণার পরপরই অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ একই পথে হেঁটে তাঁর সরকারের ফিলিস্তিন স্বীকৃতির ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, “এই প্রচেষ্টা শুরু হয় একটি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিদের মুক্তির মাধ্যমে।” একই সঙ্গে তাঁর সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ শাসন ব্যবস্থায় হামাসের কোনো ভূমিকা থাকতে পারবে না। কানাডাও একই দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয় এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।আন্তর্জাতিক পরিসরে ফ্রান্স ও সৌদি আরব গত কয়েক মাস ধরে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এই সপ্তাহে আরও কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করতে পারে বলে গুঞ্জন চলছে। ফলে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ একটি ডমিনো এফেক্ট সৃষ্টি করেছে, যা ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
এই স্বীকৃতি একদিকে পশ্চিমা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নতুন গতি আনছে। তবে ইসরায়েলের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও মার্কিন অসন্তোষের কারণে এই পদক্ষেপ কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনবে তা এখনো অনিশ্চিত। আপাতত এটুকু নিশ্চিত, মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই স্বীকৃতি এক ঐতিহাসিক মোড়, যার প্রভাব আগামী দিনের কূটনীতিতে সুদূরপ্রসারী হবে।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন