রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক : বঙ্গোপসাগরে গত তিন বছরে বাণিজ্যিক–ভিত্তিতে মাছের আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও শিল্পখাতের নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে প্রত্যেক মাছধরা অভিযানে বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন জাহাজমালিকরা।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের রেকর্ড ১ লাখ ৪৬ হাজার টন থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্যিক ট্রলারে ধরা মাছের পরিমাণ ২১ শতাংশ কমে ১ লাখ ১৬ হাজার টনে নেমে এসেছে।
সবচেয়ে বড় পতন ঘটেছে ইলিশ আহরণে। বাণিজ্যিকভাবে ধরা ইলিশের পরিমাণ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ১৩৮ টন—যা প্রায় ৭৮ শতাংশ হ্রাস পেয়ে আলোচ্য অর্থবছরে ১ হাজার ৭৯০ টনে নেমে এসেছে।
ইলিশের মতোই সার্ডিন জাতীয় মাছের আহরণও কমেছে, যদিও তা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। গত তিন বছরে এই শ্রেণির মাছের পরিমাণ ৫০ হাজার ৭৮৩ টন থেকে ৪৪ শতাংশ কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫৬৪ টনে।
অন্য প্রজাতির মধ্যে সামুদ্রিক চিংড়ি উৎপাদন বেড়েছে—১ হাজার ৯৫৪ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ২২ টন। তবে ক্যাটফিশের পরিমাণ ৫ হাজার ৬৪৬ টন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫২৪ টনে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়—পামফ্রেট ৯৩৬ টন, লাক্ষা (ক্রোকার) ২ হাজার ৬৪৪ টন, কাটলফিশ ১২ হাজার ৬৬ টন, রিবনফিশ ৪ হাজার ৬৩৫ টন, জিউফিশ ৪ হাজার ১২০ টন এবং ইল মাছ ৫ হাজার ১৯ টন ধরা পড়েছে।
এই সংকট আরও বেড়েছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য দ্রুত কমে আসায়। আগে বাণিজ্যিকভাবে আহরিত মাছের প্রজাতি সংখ্যা ছিল ১১২টিরও বেশি। তবে এ সংখ্যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৫–৫৭টিতে। এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হারানোর এক বড় ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাছ ধরার পরিমাণ ওঠানামার পর এখন ক্রমাগত কমছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে আহরণ হয়েছিল ১ লাখ ৭ হাজার ২৩৬ টন মাছ—যা ধীরে ধীরে বেড়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৫৪ টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ লাখ ১৯ হাজার ১২১ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭ টনে পৌঁছায়। তবে এরপর থেকেই মাছের পরিমাণ কমতে শুরু করে; ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামুদ্রিক মৎস্য শিকার নেমে আসে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টন।
দূষণ, অতিমাত্রায় মাছ ধরা ও নদীতে পলি জমাকে দায়ী করলেন গবেষকরা
বিজ্ঞানীরা এই পতনের পেছনে একাধিক কারণকে দায়ী করছেন। এরমধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক, ধাতব, রাসায়নিক ও তেল দূষণসহ নিয়ন্ত্রণহীন অতিমাত্রায় মাছ ধরা এবং অগভীর প্রজনন এলাকায় নির্বিচারে ট্রলার চালানো। পাশাপাশি তারা সেসব নদী রক্ষায় জোর দিয়েছেন, যেগুলো বঙ্গোপসাগরে জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের ১১৯টি নদী বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু এসব নদীর মোহনায় ব্যাপক পলি জমে সমুদ্রে পুষ্টি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পুষ্টি সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে গভীর সমুদ্রের মাছের মজুদেও।
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকারভুক্ত সমুদ্রসীমা ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার হলেও, বর্তমানে বাণিজ্যিক ট্রলার পরিচালিত হচ্ছে মাত্র ২৭ হাজার বর্গকিলোমিটারে। একই এলাকায় বারবার মাছ ধরার কারণে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের মজুদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, সীমিত বিনিয়োগ ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন