সাদ্দাম হোসেন,ঠাকুরগাঁও : সময়ের ধূসর পথে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম্যজীবনের স্পর্শ!নগরায়ন, ইন্টারনেট আর যান্ত্রিকতার জোয়ারে যখন আমাদের শেকড়ের জিনিসপত্র বিলীন হতে বসেছে, ঠিক তখনই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার এক বৈঠকখানা হয়ে উঠেছে এক টুকরো জীবন্ত ইতিহাস। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফজলে এলাহী মুকুট চৌধুরীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়া এই ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা—যেখানে ঢেঁকির শব্দ, রাখালের বাঁশির সুর আর গরুর গাড়ির চাকা যেন সময়ের বাঁধনে থেমে আছে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালান্দর ইউনিয়নের চৌধুরীহাট এলাকায় চেয়ারম্যানের বসার ঘরটি এখন আর নিছক রাজনৈতিক আলাপ বা দাপ্তরিক আড্ডার কেন্দ্র নয়। চার-পাঁচ বছর আগে শখের বশে মুকুট চৌধুরী যে উদ্যোগটি নেন, তা এখন পরিণত হয়েছে 'বৈঠকখানার জাদুঘরে'—যা নতুন প্রজন্মের কাছে অতীতের দরজা খুলে দিয়েছে।
কালের সাক্ষী নিয়ে সেজেছে দেয়াল-কোণ
সংগ্রহশালার ভেতরে ঢুকলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি পর্যায়কে ছুঁয়ে যাওয়া জিনিসপত্রগুলো এখানে সযত্নে সংরক্ষিত। কৃষকের মাথার খড়ের মাথাল থেকে শুরু করে মাছ ধরার আদিম সরঞ্জাম—জালেঙ্গা, ডেরি ও মাছ রাখার পলই—সবই যেন সুনিপুণভাবে সাজানো।
এক কোণে রাখা আছে গ্রামজীবনের সুর ও শ্রমের প্রতীক, রাখালের বাঁশি আর ধান ভাঙার ঢেঁকি, যা দেখে নতুন শিশুরা অবাক না হয়ে পারে না। ফল রাখার বেতের ঝুড়ি, খৈ ভাজার চালনি, আর মাটির তৈরি নানা আকারের পাতিল-হাঁড়ি—প্রতিটি বস্তুই যেন নীরব ভাষায় অতীতের কথা বলে।
আলো-আঁধারের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখা আছে কেরোসিনের আলো ছড়ানো লণ্ঠন আর হারিকেন। আর আদি পরিবহন ব্যবস্থার সাক্ষী হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে সুসজ্জিত পালকি, পাশে ধুলো মাখা গরুর গাড়ির চাকা এবং ঘোড়ার গাড়ির চাকা। এই সংগ্রহ কেবল জিনিসপত্রের সমাবেশ নয়, এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও শ্রম-ইতিহাসের এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি।
শুরুটা ছিল "নতুন প্রজন্ম চিনেই না" ভাবনা থেকে
চেয়ারম্যান মুকুট চৌধুরী বলেন, সত্যি বলতে, নতুন প্রজন্ম মোবাইল, টেলিভিশন, ইন্টারনেটেই মগ্ন থাকে। তারা আসল গ্রামবাংলার জিনিসপত্র চিনেই না। তাই আমি চেয়েছি এমন একটি জায়গা হোক, যেখানে তারা এলে অতীতে চলে যেতে পারবে, চোখে দেখে শিকড়ের সাথে পরিচিত হতে পারবে।"
সংগ্রহের পদ্ধতিটাও বেশ আন্তরিক। তিনি নিজের এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, কারো ঘরের চিলেকোঠা বা আঙিনার অব্যবহৃত কোণ থেকে উদ্ধার করেছেন সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া এসব অমূল্য ঐতিহ্য। এই যত্ন ও আবেগই সংগ্রহশালাটিকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
শিক্ষকের চোখে 'পাঠশালা', কৃষকের মনে শৈশব
এই বৈঠকখানার আকর্ষণ এখন শুধু স্থানীয়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসছেন এই ঐতিহ্যের আড্ডাখানা দেখতে।
স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বইয়ে এসব পড়েছি, কিন্তু এখানে হাতে ধরে দেখে মনে হলো যেন অতীতে চলে গেলাম। রাখালের বাঁশিটা দেখে দাদার মুখে শোনা গল্প মনে পড়ল।’
প্রবীণ কৃষক মহিবুল হকের কাছে এটি নস্টালজিয়া। তিনি বলেন, ‘যে মাথাল দিয়ে সারা দিন কাজ করতাম, তা এখন হারিয়ে গেছে। এখানে সেই মাথাল দেখে আমার শৈশব ফিরে এল।’
ঠাকুরগাঁও শহর থেকে আসা শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের পর্যবেক্ষণ আরও গভীর, ‘এটা শুধু সংগ্রহশালা নয়, এটি আসলে একটি পাঠশালা। শিক্ষার্থীরা এখানে এলে কেবল ইতিহাস পড়বে না, ইতিহাসকে চোখে দেখে, হাতে ছুঁয়ে অনুভব করবে।’
প্রতিবেশী গৃহিণী রাবেয়া খাতুনের চোখে ছিল বিস্ময়। তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চারা জীবনে প্রথমবার ঢেঁকি দেখে অবাক হয়ে গেছে। মোবাইলের বাইরের এই জগৎটা ওদের কাছে একেবারে নতুন।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই উদ্যোগ বেশ সাড়া ফেলেছে। অনেকে এটিকে ‘আমাদের গ্রামের ছোট্ট জাদুঘর’ বলে উল্লেখ করছেন এবং এটি যেন সরকারি উদ্যোগে আরও বড় পরিসরে সংরক্ষিত হয়, সেই দাবিও জানাচ্ছেন।
চেয়ারম্যান মুকুট চৌধুরীর চোখে এখন আরও বড় স্বপ্ন। তিনি ভবিষ্যতে এই সংগ্রহশালাকে আরও সমৃদ্ধ ও সুবিন্যস্ত করতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি চাই এ সংগ্রহশালা শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, পুরো উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে হয়ে উঠুক এক টুকরো ইতিহাসের ঠিকানা।’
ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতি ব্যক্তি অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে বলেন, ‘চারপাশের প্রবল যান্ত্রিকতার মধ্যেও এই বৈঠকখানার ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হয়, হুক্কার ধোঁয়া আর ঢেঁকির মিহি ধ্বনি—সেই সরল দিনগুলো যেন কালের আবর্তে এই বৈঠকখানায় এসে থেমে গেছে। এই সংগ্রহশালা নিঃসন্দেহে আমাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলাকে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার এক সার্থক দলিল।’
রিপোর্টার্স২৪/ প্রীতিলতা