স্টাফ রিপোর্টার: তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে অভিবাসনের পেছনে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়, তার বাইরেও বছরে ১৮ হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে যায়। ‘রেমিট্যান্স আয় পড়ে যাওয়ার একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন: বাংলাদেশের ফ্রি ভিসা অভিবাসনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিণতি উন্মোচন’ শীর্ষক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন কর্মসূচি (ওকাপ)-এর চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম।
বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের অর্থায়নে এবং হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশনের সমর্থনে ‘স্ট্রেন্থেনড অ্যান্ড ইনফরমেটিভ মাইগ্রেশন সিস্টেমস (এসআইএমএস)’ প্রকল্পের আওতায় ওকাপ এই গবেষণা পরিচালনা করে।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে শাকিরুল ইসলাম জানান, অভিবাসন ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মীদের সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। গবেষণায় ১ হাজার ৮৪ জন অভিবাসীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ কর্মী তথাকথিত ফ্রি ভিসা এবং ৪৯ শতাংশ কর্মী কাজের ভিসা নিয়ে বিদেশ গেছেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্রি ভিসা’ শব্দটি বিভ্রান্তিকর— এটি বিনামূল্যে বা আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়। বরং এটি শোষণমূলক নেটওয়ার্কের একটি হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে, পরিবারগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলেছে এবং জাতীয় রেমিট্যান্স প্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে।’
ওকাপের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অভিবাসিত প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশি কর্মী এই ‘ফ্রি ভিসা’ নিয়ে গেছেন। তারা সরকার অনুমোদিত ফি থেকে তিন থেকে ছয় গুণ বেশি অর্থ প্রদান করেছেন। এই পথ উল্লেখযোগ্য পারিবারিক অর্থনৈতিক ক্ষতি, আন্তঃপ্রজন্ম ঋণচক্র এবং সামষ্টিক রেমিট্যান্স হ্রাসের কারণ হয়েছে, যা বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ হিসেবে অনুমান করা হয়।
গবেষণার তথ্য বলছে, নিয়মিত ভিসার তুলনায় তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’-তে অভিবাসন ব্যয় অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কুয়েতে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ১ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা। কিন্তু ‘ফ্রি ভিসা’-তে কুয়েতে যেতে খরচ হয় ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৩ টাকা, আর নিয়মিত কাজের ভিসায় খরচ ৬ লাখ ১৯ হাজার ১৬৭ টাকা। একইভাবে সৌদি আরব, ওমান, কাতার ও দুবাইয়ের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ব্যয়ের তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত খরচ করতে হয় কর্মীদের।
তথ্য বলছে, তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’-তে বিপুল অর্থ ব্যয় করে গন্তব্য দেশে যাওয়ার পরও কর্মীদের আরও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এসব ব্যয়ের মধ্যে আছে ওয়ার্ক পারমিটের খরচ, নতুন কাজ পেতে ব্যয়, খাবার খরচ ইত্যাদি। সব মিলিয়ে একজন কর্মীর কাজ নিশ্চিত করতে মোট খরচ দাঁড়ায় ৭ লাখ ২২ হাজার ৭০০ টাকা। এতে গড়ে অভিবাসন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা।
গবেষণায় দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ কর্মী কোনো অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ করেছেন। ২১ শতাংশ কর্মীকে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে—প্রতি কর্মীর গড়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ৪ শতাংশ কর্মী অতিরিক্ত ৪৪ হাজার টাকা খরচ করেছেন চাকরি পাওয়ার জন্য। এভাবেই তথাকথিত ফ্রি ভিসার কারণে বিদেশে গিয়ে কর্মীদের আরও অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। সব মিলিয়ে মূল অভিবাসন ব্যয়সহ ‘ফ্রি ভিসা’ বাণিজ্যে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৮ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া। তিনি তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসা’ সম্পর্কিত আর্থিক প্রভাব নিয়ে গবেষণার তথ্য তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক রাহনুমা সালাম খান, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর মাইগ্রেশন পলিসি ও সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ইউনিটের প্রধান শ্রুতি ইশিতা এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. কাজী মাহমুদুর রহমান।
এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার প্রশাসক মো. আশরাফ হোসেন, বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান, বায়রার সাবেক সহসভাপতি নোমান চৌধুরী, ঢাকায় সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজিয়া হায়দার, ওকাপের নির্বাহী পরিচালক ওমর ফারুক এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ওকাপের প্রোগ্রাম সমন্বয়ক এ. এ. মামুন নাসিম।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব