ক্রীড়া ডেস্ক : জাহানারা আলমের অভিযোগের পর টালমাটাল বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট। আর এই আগুনে ঘি ঢাললেন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার রেশমা আক্তার আদুরি। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন জাতীয় দলের ৯৯ ভাগ নারীই অনৈতিক প্রস্তাব পান।
রেশমা আক্তার আদুরি কোচিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার সুবাদে জাতীয় দলের মেয়েদের কাছ থেকে প্রায়ই নানা রককম অভিযোগ পেতেন।
তিনি বলেন, জাহানারা মুখ খোলার পর মনে হয়েছে আমারও বলতে হবে। দেখুন, জাতীয় দল একটি মেয়ের স্বপ্ন। অত দূর যেতে যে পরিমাণ সংগ্রাম করতে হয়, সেটি শুধু সেই মেয়েই জানে।
কিন্তু ওই পর্যায়ে যাওয়ার পর যখন কুপ্রস্তাব পায়, তখন মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকে না। কারণ ওরা জানে, প্রতিবাদ করা মানে কষ্ট করে অর্জিত অবস্থান থেকে ওদের সরিয়ে দেওয়া হবে। আমার জাতীয় দলের ক্যারিয়ার খুব দীর্ঘ ছিল না। তবে আমি খুব অল্প বয়সেই কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হই।
দীর্ঘদিন নানা পর্যায়ের মেয়েদের কোচিং করানোর কিংবা ওদের পথ দেখানোর অভিজ্ঞতা থেকে জানি কতজনের সঙ্গে কত কিছু হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেনি। শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, সামান্য প্রতিবাদেও মেয়েদের ওপর কত বড় শাস্তির খড়গ নেমে আসে।
একটি ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, খাবারের মান নিয়ে মৃদু প্রতিবাদ করেছিল লতা মণ্ডল। তাতেই ওকে ২০ দিনের জন্য সাসপেন্ড করে দিয়ে অন্যদের বার্তা দেওয়া হয় যে ওখানে থাকতে হলে মুখ বন্ধ রাখতে হবে। কাজটি করেছিলেন নারী দলের তখনকার ম্যানেজার। উনার নাম এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না। শুধু এটা মনে পড়ছে যে উনি একসময় নায়ক সালমান শাহর শ্বশুর (শফিকুল হক হীরা) ছিলেন। সামান্য খাবারের কথা বলায় এত কিছু! এবার বুঝুন যৌন হয়রানির মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে মেয়েরা মুখ খুলতে চায় না কেন। তাদের মধ্যে জাহানারা নানা জায়গায় অভিযোগ করে প্রতিকার পাওয়ার চেষ্টা কম করেনি। কিন্তু অভিযোগ করার রেশ ধরে ওকে তিলে তিলে মানসিক নির্যাতন করে জাতীয় দল থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করেছে।
তিনি বলেন, বিসিবির সাবেক পরিচালক ও নারী বিভাগের প্রধান মনোয়ার আনিস খান চলে যাওয়ার পর বিসিবির নারী বিভাগে যত পুরুষ কাজ করেছেন- তাঁদের শতকরা ৮০ ভাগই মেয়েদের উত্ত্যক্ত করেছেন। নানা সময়ে কুপ্রস্তাব দেওয়া থেকে শুরু করে যতভাবে ‘অ্যাবিউজ’ করা যায়, তাঁরা সেটি করেছেন এবং জাতীয় দলের শতকরা ৯৯ ভাগ ক্রিকেটারই এসবের শিকার হয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোন পর্যায়ে গেলে জাহানারার মতো একটি মেয়ে মুখ খুলছে, বুঝতে পারেন? জাহানারাকে বলতে চাই তুমি একা নও, আমিও আছি। ওর লড়াইয়ে আমিও যোগ দিলাম। আমার ওপর চাপ আসবে, সেই ভয় আমার নেই। আমি চাই বিচার হোক। তদন্ত যখন হচ্ছে, সব কিছু নিয়ে হোক। আমাদের মেয়েদের জন্য নিরাপদে খেলার পরিবেশ তৈরি হোক। একটা সিস্টেম আসুক। বললাম না যে কাকে ছেড়ে কার কথা বলব? রেদোয়ান স্যারের সময় থেকে এখন পর্যন্ত, এই মুহূর্তে ক্রিকেট বোর্ডে অনেক বড় অবস্থানে থাকা একজনেরও সমস্যা আছে। উনারও চারিত্রিক দোষের বিষয়ে আমি অনেক মেয়ের অভিযোগ পেয়েছি।
নাজমুল আবেদীন ফাহিমের বিষয়ে অনেক মেয়ের কাছ থেকেই আমি উনার চারিত্রিক সমস্যার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। আর উনার বিরুদ্ধে চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তো আছেই। বিকেএসপির মেয়েরা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো মেয়ে ক্রিকেট খেলতে পারে বলে উনি মনেই করেন না। কোরাম শুধু জ্যোতির (নিগার সুলতানা) একার নয়, ফাহিম স্যারেরও কোরাম আছে।
এসব অভিযোগের কোন প্রমাণ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো মেয়েকে কুপ্রস্তাব দিলে কি সেটি মাইক বাজিয়ে দেয় নাকি? হ্যাঁ, আমার কাছে প্রমাণ নেই। যেহেতু জাতীয় দলের সঙ্গে অনেক দিন আমি নেই, কিন্তু কোচিং করানোর সুবাদে অনেক নারী ক্রিকেটারের সঙ্গে আমি যুক্ত। ওরা শুধু শুধু আমার কাছে এসে দুঃখ, হতাশা, বেদনার কথা বলে কেঁদে ফেলে নাকি? আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে অনেকের কাছে গেছি প্রতিকার চাইতে। বুঝতেই পারছেন, কাজ হয়নি বলেই আজ জাহানারার কান্নাও আপনারা দেখেছেন। বললাম তো, সেই রেদোয়ান স্যারের সময় থেকে সর্বশেষ হাবিবুল বাশার (নারী বিভাগের সাবেক ইনচার্জ) স্যার পর্যন্ত, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগ পুরুষেরই সমস্যা ছিল। এখানে বলে রাখি, হাবিবুল বাশার স্যার সম্পর্কে আমি খারাপ কিছু কখনো শুনিনি। উনি অবশ্য নারী বিভাগে বেশিদিন ছিলেনও না। তবে বেশির ভাগেরই সমস্যা ছিল।
কালের কণ্ঠকে দেয়া সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ