আশিস গুপ্ত
ব্রাজিলের বেলেমে যখন কপ ৩০–এর আলোচনাগুলো একের পর এক সেশনে এগোচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই বিশ্বের জীবাশ্ম জ্বালানি কর্পোরেশনগুলো এক অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ুর ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্বরা যেখানে টানাপোড়েনের কূটনৈতিকভাবে মার্জিত বাক্য সাজাচ্ছেন, সেখানে কয়লা, তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো নিঃশব্দে রাজনীতিকে সংগঠিত করছে—এক দীর্ঘস্থায়ী শিল্পকে মৃতপ্রায় ভবিষ্যৎ থেকে বাঁচাতে। এই লড়াই নতুন নয়, তবে কপ ৩০–এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তা আরও নগ্ন হয়ে পড়েছে। গত চার বছরে পাঁচ হাজারেরও বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি লবিস্ট জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় প্রবেশাধিকার পেয়েছে—সংখ্যাটি এমনই বিশাল যে এটি অনেক দেশের মোট প্রতিনিধি দলের চেয়ে বড়। আজকের লবিস্টরা আর অতীতের মতো জলবায়ু পরিবর্তনকে “মিথ্যা” বলার চেষ্টা করে না। তাদের দক্ষতা হলো আলোচনাকে এমন এক বাণিজ্যিক গোলকধাঁধায় আটকে দেওয়া, যেখানে কার্বন ক্যাপচার বা নেট জিরোর বাজার—যেসব সমাধান আগামী দশকের মধ্যে খুব কম ফল দেবে—হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে আলোচনার “যুক্তিসঙ্গত” দিশা। বাস্তবে এগুলো সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ভিত্তিক তেল কোম্পানি এক্সন বহু দশক ধরে এই লবিংয়ের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন ফাঁস হওয়া নথিগুলো দেখায়, তারা পরিকল্পিতভাবে গ্লোবাল সাউথের সরকার ও জনগণকে প্রভাবিত করেছে, অ্যাটলাস নেটওয়ার্ক নামের দক্ষিণপন্থী থিংক ট্যাংক জোটকে অর্থায়ন করে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট—জাতিসংঘ–নেতৃত্বাধীন জলবায়ু চুক্তিগুলোকে দক্ষিণ গোলার্ধে অপ্রিয় করে তোলা। জলবায়ু সংকটকে “সমস্যা নয়” বলে প্রতিষ্ঠা করতে এই নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী বাজারমুখী মতাদর্শকে ছড়িয়ে দিয়েছে বছর ধরে।গত ১ অক্টবর, বিশ্বের ২২৫টিরও বেশি সংগঠন এবং নেটওয়ার্ক স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসি)-এর জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন 'কপ ৩০' প্রেসিডেন্সির প্রতি আবেদন জানানো হয়েছিল, জলবায়ু আলোচনার টেবিলে বিশ্বের বৃহত্তম দূষণকারীদের আমন্ত্রণ জানানো বন্ধ করার। এই চিঠিটি কপ ৩০-এর মনোনীত সভাপতির সাম্প্রতিক জনযোগাযোগের প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি ব্রাজিলের বেলেমে আসন্ন জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনাকে "আমাদের সময়ের নির্দিষ্ট কার্যকর সাফল্যের সুযোগ" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং রাষ্ট্র নেতাদের নভেম্বরে জলবায়ু আলোচনায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ১ অক্টোবরের বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা, যারা সম্মিলিতভাবে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন—সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, সবুজ ধোঁয়াশা (greenwashing) এবং স্বার্থের সংঘাতের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট সুরক্ষা ছাড়া বহুজাতিক কর্পোরেশনদের আমন্ত্রণ জানানো জাতিসংঘের জলবায়ু সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কার্যকারিতা কে ক্ষুণ্ণ করে। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আসছে যখন ইউএনএফসিসি-এর কাছে প্যারিস চুক্তির উদ্দেশ্যগুলির সাথে সাংঘর্ষিক বেসরকারি স্বার্থ দ্বারা তার নীতি প্রণয়ন প্রভাবিত হচ্ছে না তা নিশ্চিত করার জন্য কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবস্থা নেই। ব্রাজিলের ফেডারেশন অফ অর্গানস ফর সোশ্যাল এন্ড এডুকেশন্যাল এসিস্ট্যান্স-এর নির্বাহী পরিচালক লেটিসিয়া টুরা বলেছেন, "পরিবেশ দূষণ এবং সরাসরি লঙ্ঘনের পাশাপাশি, বড় কর্পোরেশনগুলি কপ -গুলিতেও দূষণ করে। তাদের কপ-গুলিতে অংশগ্রহণ সীমিত করা, জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য সহযোগিতা জোরদার করা এবং অঞ্চল ও তার জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জরুরি।" আরেকজন স্বাক্ষরকারী, ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক-এর তাসনিম এসপ বলেছেন, "কর্পোরেট স্বার্থ—বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের—কয়েক দশক ধরে আক্রমণাত্মক লবিং, ভুল তথ্য এবং চাকচিক্যময় জনসংযোগ প্রচারণার মাধ্যমে পদ্ধতিগতভাবে জলবায়ু অগ্রগতিকে নাশ করেছে। কপ-এর সভাস্থলগুলি সংকটের চালক সেই শিল্পগুলির জন্য বিপণনের খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে, অথচ আদিবাসী জনগণ এবং সম্মুখ সারির সম্প্রদায়গুলি অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।"
এই চিঠিটি ব্যবসায়িকদের প্রতি অবাধ আমন্ত্রণকে "দূষণকারী ব্যবসায়, এবং তাদের সহায়তাকারীরা, যে সরাসরি জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী সেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন" বলে সমালোচনা করেছে। উপরন্তু, এটি 'কপ ৩০' সংগঠকদের একটি পিআর সংস্থার সাথে অংশীদারিত্বের উদ্বেগজনক প্রকৃতিকে তুলে ধরেছে, যারা একই সাথে বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলির স্বার্থ প্রচার করে, যা জলবায়ু কূটনীতির কেন্দ্রে থাকা গভীর স্বার্থের সংঘাতকে তুলে ধরে। স্বাক্ষরকারীরা এই ব্যবস্থার অবিলম্বে সমাপ্তি এবং কপ ৩০ যেন জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্প ও অন্যান্য দূষণকারী শিল্প দ্বারা ক্ষুণ্ণ না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের দাবি জানিয়েছে । জাস্ট ট্রানজিশন অ্যালায়েন্স-এর ফার্নান্দো টর্মোস-আপোন্তে বলেছেন, "যদিও দাবি করা হচ্ছে যে এটি একটি ন্যায্য উত্তরণের জন্য একটি ঐতিহাসিক বছর, তবুও পরিবেশগত ন্যায়বিচার গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়গুলি কপ ৩০ থেকে বাদ পড়েই চলেছে অথচ দূষণকারীরা প্রথম সারিতে জায়গা পাচ্ছে। জলবায়ু সংকটে প্রভাবিত গোষ্ঠী এবং এটিকে মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো ন্যায্য উত্তরণ হতে পারে না।"স্বাক্ষরকারীরা কপ ৩০ প্রেসিডেন্সির কাছে চারটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দাবি করেছিল :১.দূষণকারী-মুক্ত কপ : দূষণকারী কর্পোরেশনদের কাছ থেকে কোনো কর্পোরেট স্পনসরশিপ থাকবে না।২.দূষণকারী-মুক্ত প্রেসিডেন্সি: দূষণকারীদের সাথে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য কোনো নেতৃত্বের ভূমিকা থাকবে না, যার মধ্যে এডেলম্যান পিআর ফার্মের সাথে অংশীদারিত্বের সমাপ্তি অন্তর্ভুক্ত।৩.জলবায়ু আলোচনাকে এমন শিল্পগুলি থেকে রক্ষা করা এবং জবাবদিহিতা কাঠামোর অগ্রগতি নিশ্চিত করা, যাদের মুনাফা রক্ষার জন্য জলবায়ু পদক্ষেপকে দুর্বল করার ইতিহাস আছে। ৪.প্রকৃতির বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, বিশেষ করে আমাজন রেইনফরেস্ট কে সুরক্ষিত করা।
এই চিঠির এক মাস দশ দিন পরে ১০ নভেম্বর আমাজন রেইনফরেস্ট-এর বুকে বেলেম শহরে 'কপ ৩০' শুরু হলো। বিশ্বের প্রায় ২০০ টি দেশের প্রতিনিধিরা হাজির হয়েছেন সম্মেলনে। এই প্রতিবেদন যখন লিখছি তখন সম্মেলন প্রথম ৬ দিন পার করে সপ্তম দিনে পড়েছে। প্রথম সপ্তাহে দেখা গেলো বিশ্বের ২২৫টিরও বেশি সংগঠন কপ ৩০-এর আয়োজকদের কাছে ‘পলিউটার–মুক্ত কপ’-এর দাবি জানালেও সাড়া মেলেনি। কর্পোরেট দখলদারিত্ব থেকে আলোচনাকে মুক্ত করার জন্য কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিন দশকের আলোচনা সত্ত্বেও জীবাশ্ম জ্বালানি নিষ্কাশন কমানো, বাস্তবসম্মত সমাধান গ্রহণ এবং ন্যায়বিচার ভিত্তিক জলবায়ু পদক্ষেপ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বরং প্রমাণ জমা হচ্ছে যে ফসিল ফুয়েল শিল্প পরিকল্পিতভাবে এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে—এবং যতক্ষণ পর্যন্ত এই বাধা দূর না করা হবে, ততক্ষণ কপ ৩০ তো বটেই, ভবিষ্যতের সব কপ-ই ব্যর্থ হওয়ার জন্য অভিশপ্ত থাকবে। কপ ৩০-এর হলগুলোতে রেকর্ড সংখ্যক ১,৬০২ জন জীবাশ্ম জ্বালানির লবিস্ট ঘোরাফেরা করছেন বলে 'কিক বিগ পলিউটার্স আউট' (কেবিপিও) গোষ্ঠীর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর অর্থ হলো এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতি ২৫ জনের মধ্যে একজন হলেন লবিস্ট। জলবায়ু পদক্ষেপের নীতি নির্ধারণে 'বৃহৎ দূষণকারীদের' ক্ষমতা বন্ধের দাবি নিয়ে গঠিত ৪৫০ টিরও বেশি সংস্থার জোট হলো 'কিক বিগ পলিউটার্স আউট' (কেবিপিও), যারা প্রতি বছর রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে উপস্থিত লবিস্টদের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে থাকে। তাদের বিশ্লেষণ অনুসারে, ১,৬০২ জন লবিস্টের এই সংখ্যাটি সম্মেলনে প্রায় যেকোনো দেশের প্রতিনিধি দলের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি; শুধুমাত্র স্বাগতিক ব্রাজিলই (৩,৮০৫ জন) এর চেয়ে বেশি প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আনুপাতিকভাবে, কপ ৩০-এ জীবাশ্ম জ্বালানির লবিস্টদের এই উপস্থিতি গত বছর আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু আলোচনার তুলনায় ১২% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কেবিপিও তাদের পর্যবেক্ষণ শুরু করার পর থেকে এটিই লবিস্টদের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দশটি দেশের সমস্ত প্রতিনিধির (মোট ১,০৬১ জন) সম্মিলিত প্রবেশের চেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ বেশি প্রবেশপত্র এই জীবাশ্ম জ্বালানির লবিস্টদের দেওয়া হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল এমিশনস ট্রেডিং অ্যাসোসিয়েশন এক্সনমোবিল, বিপি এবং টোটালএনার্জিসের মতো তেল ও গ্যাস সংস্থাগুলির প্রতিনিধি সহ মোট ৬০ জনকে কপ ৩০-এ নিয়ে এসেছে। কেবিপিও আরও জানিয়েছে, গ্লোবাল নর্থের কিছু দেশও তাদের সরকারি প্রতিনিধিদলে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। যেমন ফ্রান্স তার দলে সিইও প্যাট্রিক পৌইয়ানে সহ টোটাল এনার্জি থেকে পাঁচজন সহ মোট ২২ জন জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতিনিধিকে রেখেছে। কেবিপিও -এর সদস্য জ্যাক্স বনবন এক বিবৃতিতে বলেছেন, "এটা সাধারণ জ্ঞান যে যারা একটি সমস্যার কারণ, তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিলে সেই সমস্যার সমাধান করা যায় না।" তিনি কঠোর ভাষায় যোগ করেন, "তবুও তিন দশক এবং ৩০টি কপ সভার পরেও, ১,৫০০-এর বেশি জীবাশ্ম জ্বালানির লবিস্টরা জলবায়ু আলোচনায় এমন ভাবে ঘোরাফেরা করছে যেন এটা তাদেরই স্থান। কপ ৩০ একটি 'বাস্তবায়ন কপ ' হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু এটি সেই সঙ্কট মোকাবেলার জন্য আয়োজিত সম্মেলনে বৃহৎ দূষণকারীদের বাইরে রাখার মতো একটি মৌলিক দাবিও বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।"
কিন্তু পৃথিবীর বাস্তবতা লবিস্টদের ভাষ্যকে প্রতিদিন আরও অচল করে দিচ্ছে। আবহাওয়া আর কোনো দূরবর্তী বৈজ্ঞানিক সতর্কতা নয়—এখন তা সরাসরি মানুষের ঘাড়ে নেমে আসা বিপদ। ফিলিপাইনে পরপর দু’টি টাইফুন, উওয়ান ও কালমেগি; ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে দুর্যোগ; আফ্রিকা ল্যান্ডস্কেপে খরা—সবই এক নতুন পৃথিবীর বার্তা দিচ্ছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে লিবিয়ার ডারনায় যে রাতারাতি মৃত্যুর নদী নেমে এসেছিল, তা আমাদের বলে দেয় যে জলবায়ু বিপর্যয় আর শুধু পরিবেশগত নয়—এটি অস্তিত্ব সংকট। তারপরও গ্লোবাল নর্থের রাজনীতিতে জলবায়ু সংশয়বাদ দেখলে বোঝা যায়, পরিবর্তনের গতি যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের অবস্থান যেন এক প্রতীকী সতর্কতা—যে শক্তিগুলো বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার করে, তারা শুধু নির্বাচনে জয়ী হয় না, তারা নীতিকে থামিয়ে দিতে পারে। একই দৃশ্য লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার নানা দেশে দেখা যাচ্ছে। বামপন্থী দলগুলোও কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করতে নিজেদের অবস্থান নরম করছে—যেন জলবায়ু নীতি এখন ভোটের বোঝা, ভবিষ্যতের ন্যায়বিচার নয়। তবুও আশার আলো সহজে নিভে যায়নি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি এমন গতিতে এগোচ্ছে যে বাজার নিজেই জীবাশ্ম জ্বালানিকে অচল করতে শুরু করেছে। সৌর শক্তি, বায়ুশক্তি, ব্যাটারি প্রযুক্তি—যে দ্রুততার সাথে সস্তা হয়েছে তা নব উদারবাদী অর্থনৈতিক যুক্তিকেও চ্যালেঞ্জ করছে। চীনের মতো দেশ ইতিমধ্যেই ধারণার চেয়ে দ্রুত নিঃসরণ কমাতে শুরু করেছে, যা বৈশ্বিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলেছে, আগামী পাঁচ বছরে যত নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তা গত চার দশকের মোট অর্জনকে ছাড়িয়ে যাবে। একসময় অসম্ভব মনে হওয়া জ্বালানি বিপ্লব এখন অঙ্কের মতো বাস্তব। কিন্তু প্রশ্নটি কঠোর এবং নির্মম, এই রূপান্তর কি যথেষ্ট দ্রুত? গ্লোবাল সাউথে যখন মানুষ প্রতি বছর হাজারে হাজারে মৃত, তখন কি গ্লোবাল নর্থের ইট-কাঠের শহরগুলোতে সমান মাত্রার দুর্যোগ না নামা পর্যন্ত বাস্তব পরিবর্তন ঘটবে না? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি—কিন্তু মেনে নিতে চাই না। জলবায়ু সংকট দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের রূঢ়তম সত্য। আর আজকের মরা নদী, ভেঙে যাওয়া বাঁধ, ডুবে যাওয়া শহর, ঝড়ে উড়ে যাওয়া গ্রাম—সবই ইতিহাসের সেই কালো দাগ হয়ে থাকবে, যার পাশে লেখা থাকবে একটি প্রশ্ন: রূপান্তরের ক্ষমতা যখন আমাদের হাতেই ছিল, তখন আমরা কেন দেরি করলাম? কপ ৩০ এই প্রশ্নের সামনে পৃথিবীকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—পৃথিবীর পাশে থাকব, নাকি লবিস্টদের দীর্ঘশ্বাসে ডুবে যাওয়া ভবিষ্যতের দিকে হাঁটব।