শাহানুজ্জামান টিটু :
আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আদৌ হবে কি না এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। নির্বাচন নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা আগে থেকেছে, তবে সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি ফেসবুক পোস্ট পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানালেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অনুকূলে নেই। এদিকে তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এমন অবস্থায় দেশে ফিরতে না পারার বেদনা তিনি প্রকাশ করেছেন।
তারেক রহমান লিখেছেন—
“সঙ্কটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্খা যে কোন সন্তানের মত আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মত এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়… রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতিক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।”
তার এই বক্তব্য নির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে কী বার্তা দেয়? প্রশ্নটি এখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।
নির্বাচন এবং তারেক রহমানের মন্তব্য, সংযোগ কোথায়?
সরকার ঘোষণা করেছে ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও নাজুক, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিদ্যমান, অর্থনীতি চাপের মুখে, আর বিভিন্ন দলের মাঝে অবিশ্বাস ও অস্থিরতা প্রকট।
বিএনপি নির্বাচনী ট্রেনে উঠেছে অনেকে এমন দাবি করলেও, মূল বাস্তবতা এর চেয়ে অনেক জটিল। ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে বিএনপিকে কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতায় যেতে হয়েছে। দলটি না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকত কি না সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিএনপির প্রথম দাবি ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন। কিন্তু লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ও তারেক রহমানের বৈঠকের পর দলটি সে দাবি থেকে সরে এসে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রস্তাব দেয়, যা সরকারও মেনে নেয়। এখান থেকেই বিএনপির জন্য বিবিধ জটিলতার সূচনা। এই সময়সীমা দীর্ঘ হওয়ায় দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের সুযোগ মিলেছে এমন অভিযোগ বিএনপির ভেতর থেকেই শোনা যাচ্ছে। তারেক রহমানের পোস্ট সেই শঙ্কাকেই আরও জোরালো করে।
সরকার কি আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে?
তারেক রহমান বলেছেন, “রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হলেই তিনি দেশে ফিরবেন।” অর্থাৎ এখনও তিনি মনে করছেন রাজনৈতিক নিরাপত্তা, নির্বাচনী নিশ্চয়তা ও সার্বিক পরিস্থিতি BNP-র জন্য আশ্বস্ত পর্যায়ে পৌঁছেনি।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন সরকার তার দেশে ফেরা নিয়ে কোনো বাধা দিচ্ছে না। কোনো আপত্তি নেই। তাহলে বাধা কোথায়? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।
তারেক রহমানের বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছেন সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি এখনো সন্তুষ্ট নন। ফলে নির্বাচন কতটা নিশ্চিত তা নিয়েও সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিরতা নির্বাচনের পথে বড় বাধা
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীল হয়নি। প্রকাশ্য খুনের ঘটনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা রাজনৈতিক বিভাজন। জামায়াত ইসলামী সহ ছোট দলগুলোর অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা, এই সব মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে মানুষের আস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে আবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্য এমন অভিযোগও আছে।
আন্তর্জাতিক সংযোগ: নিরাপত্তা প্রধানের ভারত ও অন্যান্য সফর
বিভিন্ন সূত্র বলছে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফাঁসি রায় ঘোষণার পর জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান ভারত সফর শেষ করেছেন, এবং আরও বিদেশ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলি স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম নাকি পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় জরুরি বৈঠক এ নিয়ে প্রশ্ন জনমনে রয়েছে।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের মন্তব্য এবং এসব গতিবিধি মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট।
বিএনপি কি "ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ" হারিয়েছে?
অনেকে বলছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বিএনপি সহজেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারত, কিন্তু "ফাঁকা মাঠে গোল" দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমি এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নই। কারণ একটি সংগঠিত রাজনৈতিক দল এমন প্রতিযোগিতাহীন খেলায় অংশ নেবে কেন, যেখানে গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত—প্রতিদ্বন্দ্বী—অনুপস্থিত?
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ফুটবল ম্যাচ নয়; বরং দায়িত্ব, নীতি ও ভবিষ্যৎ কৌশলের বিষয়।
জামায়াতসহ কিছু দলের উদ্দেশ্যবিহীন আন্দোলন , নতুন প্রশ্ন
কয়েকদিন আগেই জামায়াতসহ কয়েকটি দল আকস্মিকভাবে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। পরে আবার সব নীরব। এমন আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল? জনমনের প্রশ্ন, এটি কি ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বানচাল বা অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনার অংশ? নাকি বাহ্যিক প্রভাবিত কোনো চাপ সৃষ্টির কৌশল?
তারেক রহমানের পোস্ট শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সংকেত।
তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না এ তথ্য নিজেই প্রমাণ করে রাজনৈতিক পরিবেশ এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই।
আর পরিবেশ প্রস্তুত না হলে নির্বাচন কতটা নির্বিঘ্নে হবে এ প্রশ্ন করা খুবই যৌক্তিক।
দেশ একটি গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক ভূমিকা, বিরোধী দল সবকিছু মিলিয়ে একটি সমন্বিত আস্থার পরিবেশ তৈরি না হলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সংশয় দূর হবে না।
লেখক সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট