আশিস গুপ্ত
"মেলোনি সরকারের বাজেট আইনকে না বলুন—ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ান এবং গণহত্যা বন্ধ করুন!" এই স্লোগানকে সামনে রেখে আবার একবার জনজীবন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ইতালিতে। গত তিন মাসে তিনবার। ২৮ নভেম্বর দেশটির সর্ববৃহৎ শ্রমিক সংগঠন ইউনিয়ন সিঁদাকালে দি বেস (ইউএসবি)–এর ডাকা সাধারণ ধর্মঘটটি ছিল শ্রমিক অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি শক্তিশালী সংমিশ্রণ।
ধর্মঘটের পরের দিন অর্থাৎ ২৯ নভেম্বর রোমে ছিল জাতীয় বিক্ষোভ পদযাত্রা। এই পদযাত্রায় বিশ্বখ্যাত জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গ এবং ফিলিস্তিন অধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ–এর উপস্থিতি আন্দোলনকে জাতীয় গণ্ডি থেকে বের করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচারের সুযোগ করে দিয়েছে।
এই সাধারণ ধর্মঘটের মূল দাবি ছিল ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কাজের পরিবেশের উন্নতি এবং পেনশন সংক্রান্ত অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। তবে এর তাৎপর্য অর্থনৈতিক গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক রূপও নিয়েছে। দেশের পরিবহন খাতে এর ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়—ট্রেনিটালিয়া রেল পরিষেবা ও আইটিএ এয়ারওয়েজ–এর ফ্লাইট ব্যাহত হয়। নেপলস ও ভেনিস বিমানবন্দর যাত্রীদের বিলম্ব ও ফ্লাইট বাতিলের সতর্কতা দেয়।
ইউএসবি এই ধর্মঘটের মাধ্যমে কমপক্ষে ২,০০০ ইউরো মূল বেতন, ৬২ বছর সর্বোচ্চ অবসর বয়স এবং চুক্তিভিত্তিক শ্রমব্যবস্থার অবসান দাবি করে। তারা প্রধানমন্ত্রীর সরকারকে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি ও যুদ্ধংদেহী মনোভাবের জন্য সমালোচনা করে, যা প্রতিবাদকে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক মাত্রা দেয়।
শুধু অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া নয়, ধর্মঘটের একটি আন্তর্জাতিক মাত্রাও ছিল। গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাতে আহ্বান জানানো হয়, যা সরকারের বৈদেশিক নীতি এবং ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে দক্ষিণপন্থী সরকারের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে। এর ফলে ইতালির বামপন্থী ও প্রগতিশীল সমাজ একজোট হয় এবং আন্দোলনটি নৈতিক ও মানবিক প্রশ্নে রূপ নেয়।
উল্লেখ্য, গত ৩ অক্টোবর গাজার সমর্থনে সিজিআইএল এবং ইউএসবি যৌথভাবে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে এবং ইসরায়েলে যাওয়া–আসা করা সামুদ্রিক পণ্য পরিবহন কয়েকদিন ব্যাহত হয়।
২৯ নভেম্বরের রোমের পদযাত্রাটি ছিল প্রতীকী বিজয়। এটি ইতালির শ্রমিক অসন্তোষের পাশাপাশি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে সমালোচনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি আন্দোলনের শক্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। গ্রেটা থানবার্গের উপস্থিতিতে আন্দোলন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রধান আলোচনায় উঠে আসে। তিনি মানবাধিকার ও জলবায়ু সংকট—দুই ইস্যুর সংহতির বার্তা দেন। অন্যদিকে ফ্রান্সেসকা আলবানিজ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রশ্নে সরকারের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেন।
এছাড়া পিঙ্ক ফ্লয়েডের সাবেক নেতা রজার ওয়াটার্স–এর সমর্থন আন্দোলনের আবেগকে আরও তীব্র করে, যা সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও বিস্তৃত হয়।
এই উচ্চ–প্রোফাইল আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সরকারের জন্য কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো–মুখী অবস্থান বজায় রেখেও সরকার মানবিক সংকটে নিরপেক্ষতা বা নীরবতার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়ে।
অর্থনৈতিকভাবে এই ধর্মঘট সরকারের সামাজিক নীতির দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মজুরি স্থবিরতার সময়ে সরকারের ব্যর্থতা ভবিষ্যতে আরও আন্দোলনের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে বাম–মধ্যবাম দলগুলোর জন্য এটি শ্রমিকশ্রেণীর সমর্থন পুনরুদ্ধার ও ফিলিস্তিন সংহতির ভিত্তিতে রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করার সুযোগ তৈরি করেছে।
আগামী ১২ ডিসেম্বর সিজিআইএল–এর ডাকা বড় ধর্মঘট ইঙ্গিত দিচ্ছে—নভেম্বরের এই আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ইতালিতে এক ধারাবাহিক ‘উত্তপ্ত শরৎ’ বা শিল্প অস্থিরতার সূচনা করেছে।
২৮ নভেম্বরের ধর্মঘট ইতালির রাজনৈতিক পটভূমিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। শ্রমিক অসন্তোষ এখন শুধু অর্থনীতি নয়—সরকারের আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতি দক্ষিণপন্থী সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ এবং বিরোধীদের জন্য রাজনৈতিকভাবে পুঁজি গড়ার সুযোগ এনে দিয়েছে।
এই ধারাবাহিক শিল্প আন্দোলন ইতালির রাজনীতিকে আগামী সাধারণ নির্বাচন (সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ২০২৭) পর্যন্ত গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। মেলোনি সরকারের জন্য এটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা—অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক নীতির প্রশ্নে সরকারকে তীব্র জনবিরোধিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি