আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি:
ভারত ও কানাডার মধ্যে টানাপোড়েনপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের জমাট বরফ খানিকটা গলতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রোববার দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী—এস জয়শঙ্কর ও অনিতা আনন্দ—ফোনে কথা বলেছেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন উষ্ণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই ফোনালাপের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নতুন কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে এক্স-এ অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছিলেন, তিনি কার্নির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য কাজ করতে ইচ্ছুক। তবে জয়শঙ্কর ও আনন্দের এই সরাসরি সংলাপ দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের সংলাপ পুনরারম্ভের আরও সুস্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
জয়শঙ্কর তার পোস্টে জানান, “আমি কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। তাকে তার দায়িত্বের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছি এবং ভারত-কানাডা সম্পর্কের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছি। তাকে একটি সফল মেয়াদ কামনা করেছি।”
অন্যদিকে, অনিতা আনন্দও এক্স-এ জয়শঙ্করকে ধন্যবাদ জানান এবং লেখেন, “ভারত-কানাডা সম্পর্ক জোরদার করা, আমাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করা এবং অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আজকের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমি একসাথে আমাদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ।”
এই ফোনালাপ এমন সময়ে হচ্ছে যখন কানাডা আগামী মাসে জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক হতে যাচ্ছে। ভারত বিগত ছয়বার এই শীর্ষ সম্মেলনে আউটরিচ সেশনে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছে এবং এবারও আমন্ত্রণ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। অস্ট্রেলিয়া ও ইউক্রেনকে ইতিমধ্যে অতিথি তালিকায় রাখা হয়েছে বলে জানা গেলেও, ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত-কানাডা সম্পর্কে এক অপ্রত্যাশিত টানাপোড়েন শুরু হয় যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় খুন হওয়া কানাডিয়ান নাগরিক ও খালিস্তানি নেতা হারদীপ সিং নিজ্জারের মৃত্যুর জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করেন। ভারত তৎক্ষণাৎ এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং পাল্টা অভিযোগ তোলে যে কানাডা দীর্ঘদিন ধরে ভারত-বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলিকে আশ্রয় দিচ্ছে।
পরবর্তীতে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ ভারতীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টার তদন্ত শুরু করে এবং ভারতীয় হাইকমিশনার সঞ্জয় কুমার ভার্মা সহ ছয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়। ভারতও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সংকটময় করে তোলে।
তবে গত এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী কার্নির বিজয়ের পরপরই মোদীর অভিনন্দন বার্তা দুই দেশের মধ্যে পুনঃ সংলাপের সম্ভাবনার প্রথম লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। সেই পোস্টে মোদী লেখেন, “ভারত ও কানাডা অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার এবং প্রাণবন্ত জনগণের সম্পর্ক দ্বারা আবদ্ধ। আমি আমাদের অংশীদারিত্ব জোরদার করতে এবং আমাদের জনগণের জন্য বৃহত্তর সুযোগ তৈরি করতে আপনার সঙ্গে কাজ করার জন্য অপেক্ষা করছি।”
কার্নির জয়ের আগে একজন কানাডিয়ান গোয়েন্দা কর্মকর্তা ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। যদিও সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, তবে এই মন্তব্যও দুই দেশের মধ্যে অতিরিক্ত উত্তেজনা তৈরি করে।
তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ইঙ্গিত ও বার্তা বিনিময় পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ফোনালাপ এবং নেতৃবৃন্দের শুভেচ্ছাবার্তা, একটি সম্ভাব্য পুনঃসংশ্লেষের সূচনা বিন্দু হিসেবে দেখা যেতে পারে। এখন দেখার বিষয়, জি৭ সম্মেলন কিংবা অন্য কোনো বহুপাক্ষিক মঞ্চে এই উষ্ণতা বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ নেয় কি না।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব