মুহাম্মদ সুহায়ব: বলিউডের ছবি আপনে–র শুটিং চলাকালে রোমান উর্দুতে লেখা সংলাপ পড়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছিলেন পাকিস্তানি অভিনেতা জাভেদ শেখ। ছবিটি বিজেতা ফিল্মসের প্রযোজনা, যেখানে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন পুরো দেওল পরিবার। প্রধান চরিত্র বালদেব সিং চৌধুরীর বন্ধুর ভূমিকায় ছিলেন জাভেদ শেখ। তিনি প্রোডাকশন টিমকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁর সংলাপগুলো উর্দুতে লেখা হয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন স্ক্রিপ্ট চলে এল। অবাক হয়ে তিনি জানতে চাইলেন এত দ্রুত কাজটি কীভাবে হলো। তখনই জানা গেল বালদেব সিং চৌধুরীর চরিত্রে অভিনয় করা নায়কটিও হিন্দি পড়তে পারেন না, তাই তাঁর সংলাপও উর্দুতেই লিখে দেওয়া হয়।
সেই অভিনেতা আর কেউ নন বলিউডের ‘হি-ম্যান’ খ্যাত কিংবদন্তি ধর্মেন্দ্র, ছবিটির প্রযোজকও বটে। উর্দু ভাষায় তাঁর সাবলীলতা ছিল অসাধারণ।
আজ (৮ ডিসেম্বর) ধর্মেন্দ্র ৯০ বছরে পা দিতেন। গত ২৪ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হলেও পাকিস্তানে ভারতীয় কনটেন্ট সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বহু ঘণ্টা ধরে সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছেন তিনি। সত্তর ও আশির দশকের যে সব প্রজন্ম তাঁর ছবিতে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে ধর্মেন্দ্র ছিলেন এক অনন্য আইকন।
বিভক্তির ১২ বছর আগে ভারতের অবিভক্ত পাঞ্জাবের এক গ্রামে জন্মেছিলেন ধর্মেন্দ্র। ছোটবেলায় তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিল বহু মুসলিম বন্ধু। হিন্দু–মুসলিম সহাবস্থানের সহজ-সরল পরিবেশ ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছিলেন, ১৯৪৭ সালে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করলে তিনি তাঁর প্রিয় শিক্ষক মাস্টার রুকনউদ্দীনের পা জড়িয়ে ধরেছিলেন অনুরোধ করেছিলেন দেশ না ছাড়তে। কিন্তু ভাগ্যের পরিণতি ঠেকানো যায়নি।
১৯৫০-এর শেষ দিকে একটি ট্যালেন্ট কনটেস্ট জিতে মুম্বাই আসেন ধর্ম সিং দেওল। কিছুদিনের মধ্যেই অভিনয়ের দুনিয়ায় প্রবেশ। পাকিস্তানে তখন ভারতীয় চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ। ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা সীমান্তের এপারে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল। পাকিস্তানি নির্মাতারাও তাঁর অ্যাকশন ঘরানার অনুকরণে তেমন উদ্যোগী হননি।
তবে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি এসে বলিউডের ছবি পাকিস্তানের অভিজাত বাড়ির ড্রয়িংরুমে পৌঁছাতে থাকলে ধর্মেন্দ্র দ্রুতই পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। একইসঙ্গে ভারতে পাকিস্তানি পাঞ্জাবি ও উর্দু ছবি দেখা, বিশ্লেষণ ও রিমেক করার সংস্কৃতিও গড়ে ওঠে।
চলচ্চিত্র প্রযোজক রশীদ খওয়াজা স্মরণ করেন অউর প্যায়ার হো গয়া (১৯৯৭) ছবির একটি পারিবারিক প্রদর্শনীতে ঘটে যাওয়া মজার ঘটনা। খওয়াজা তখন অনেক বছর আমেরিকায় কাটিয়ে ফিরেছেন। কিন্তু ধর্মেন্দ্র যখন শুনলেন তিনি পাকিস্তান থেকে এসেছেন, তখনই উত্তেজিত হয়ে পুরোনো পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের মুখস্থ সংলাপ বলতে শুরু করলেন।
রশীদ খওয়াজা বলেন, সারা দেওল পরিবারই মুনাওয়ার জারিফের বিশাল ভক্ত ছিল। তাঁরা তাঁর বিখ্যাত ছবি নওকর ওহতি দা–র (১৯৭৪) রিমেক করেছিলেন নওকর বিবি কা (১৯৮৩) নামে। পাকিস্তানের কথা উঠলেই ধর্মজি আবেগে ভেসে যেতেন।
তিনি আরও জানান, তাঁর ছেলে ফাইজান খওয়াজা মুম্বাইয়ের হুইসলিং উডস ইন্টারন্যাশনালে অধ্যয়নকালে ধর্মেন্দ্র–হেমা মালিনীর কনিষ্ঠ কন্যা আহানার সহপাঠী ছিলেন। ফাইজানকে আহানার বিবাহেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
ধর্মেন্দ্রর অনুরোধে যেসব পাকিস্তানি ছবি ভারতে রিমেক হয়েছিল তার মধ্যে মৌলা জাট (১৯৭৯) অন্যতম। সেটি সেখানে জীনে নাহি দুঙ্গা (১৯৮৪) নামে নির্মিত হয়। ধর্মেন্দ্র অভিনয় করেন সুলতান রাহির চরিত্রে, শত্রুঘ্ন সিনহা হয়েছেন নূরি নট, আর রাজ বাব্বর অভিনয় করেন কাইফির করা মুডার ভূমিকায়।
লন্ডনে অভিনেতা মুস্তাফা কুরেশির সঙ্গে সাক্ষাতে ধর্মেন্দ্র জানিয়েছিলেন তিনি নূরি নট চরিত্রটি করতে চেয়েছিলেন। কুরেশি বলেন, তিনি আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে গিয়ে আমাদের ছবির লাইব্রেরি দেখিয়েছিলেন। বলেছিলেন তিনি এগুলো অত্যন্ত পছন্দ করেন।
অভিজ্ঞ চিত্রনির্মাতা সৈয়দ নূর জানান, ২০১০-এর দশকে তিনি ধর্মেন্দ্র ও নাদিমকে নিয়ে একটি ছবি পরিকল্পনা করেছিলেন দুই বন্ধুর বিভক্তির পর প্রথমবার সাক্ষাতের গল্প। ধর্মজি কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা ও পিঠের অস্ত্রোপচারের কারণে প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
প্রথম দেখায় নূর মজা করে বলেছিলেন ‘মেরি ফিল্ম কপি কর লি’। তিনি সাঙ্গদিল (১৯৮২)–এর কথা বলছিলেন, যা পরে ভারতীয় ছবিতে ঝূঠা সত্য (১৯৮৪) নামে রিমেক হয়। ধর্মেন্দ্র সেখানে করেছিলেন নাদিমের চরিত্র। কিন্তু তিনি রাগ না করে বলেছিলেন, নাদিমকে আমার সালাম দিও। দারুণ কাজ করেছে।
ধর্মেন্দ্রর মানবিকতা ছিল ঠিক এমনই সরল, উষ্ণ, নিরহংকারী। তিনি প্রায়ই বলতেন, ভারত আমার মা হলে পাকিস্তান আমার মামী। এক সরল বাক্য, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের উদারতা বোঝাতে যথেষ্ট।
ববি (১৯৮৪) ছবিটিও ভারতে দাদাগিরি (১৯৮৭) নামে রিমেক হয়, যেখানে ধর্মেন্দ্র অভিনয় করেন মোহাম্মদ আলীর চরিত্রে। ছবিতে সাবিতা ও জাভেদ শেখ দু’জনই ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ।
জাভেদ শেখ জানান, ‘আপনে–র শুটিং চলাকালে ব্যাংকক, কানাডা, দিল্লি, মুম্বাই অনেক জায়গায় তাঁর সঙ্গে ছিলাম। পাকিস্তানের কোনো শিল্পী গেলে ধর্মজি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে তাদের গ্রহণ করতেন।’
ধর্মেন্দ্রর সংগ্রহে ছিল কামাল আহমেদ রিজভীর আলিফ নুন–ও। নানহার অভিনয় তাঁকে ভীষণ আনন্দ দিত। শামা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল নানহার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনি শুটিং বাতিল করেছিলেন। তাঁর আচরণ ছিল এমন যেন কোনো আপনজনকে হারিয়েছেন।
অনেকের কাছে ধর্মেন্দ্র শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক নন তিনি ছিলেন এক যৌথ সাংস্কৃতিক স্মৃতির প্রতীক। ভারত–পাকিস্তান রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও তিনি ছিলেন উষ্ণতা, বন্ধুত্ব ও মানবিকতার বাতিঘর। তাঁর মৃত্যু যেন দুই দেশের মধ্যে থাকা শেষ সেতুটিকে আরও ক্ষীণ করে দিল।
ধর্মেন্দ্র ছিলেন সেই শেষ আশ্বাস যাঁকে দেখে বিশ্বাস জন্মাতো যে একদিন হয়তো ভারত ও পাকিস্তান আবারও মানবিকতার জায়গায় ফিরে দাঁড়াতে পারবে।- ডন
রিপোর্টার্স২৪/এসসি