এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র, মানবতা ও মানবাধিকারের কথা বলে গলা ফাটালেও প্রকৃত অর্থে মানবতা ও মানবাধিকারের শত্রু বলেই বিশ্ববাসী মনে করে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’ নামক রাষ্ট্রটিকে। তাদের সামরিক আগ্রাসনে বারবার বিশ্ব বিপর্যস্ত হয়েছে। নিজেদের স্বার্থে তারা বহু রাষ্ট্রকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ঐ সকল রাষ্ট্রগুলোতে লুটের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন আগ্রাসনের কারণে মানবতা ও মানবাধিকার আজ ধুঁকে ধুঁকে কেঁদে মরছে। মানবতা ধ্বংস ও দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বের সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে। এ সুপার পাওয়ার হওয়ার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস।
আন্তর্জাতিক আইনের কোরাস তোয়াক্কা না করে, আইনকে পদদলিত করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে, সেই দৃশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না। আগ্রাসী নীতির নজিরবিহীন এই ঘটনা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের পরিপূর্ণ লঙ্ঘন, তেমনি ঘটনাটি বৃহৎ রাষ্ট্রের যা খুশি তা করার বিপজ্জনক এক দৃষ্টান্ত হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নগ্ন হামলা ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অশান্তি ও গৃহযুদ্ধের হুমকি এবং লাতিন আমেরিকাজুড়ে সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত অজুহাত অগ্রহণযোগ্য। ব্যবসায়িক বাস্তববাদের ওপর আদর্শিক বৈরিতা জয়লাভ করেছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে আনতে গিয়ে স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বিমানঘাঁটি, সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে বিশাল হামলা চালান। এ হামলায় সামরিক–বেসামরিক মিলিয়ে প্রায় ৪০ জন নিহত হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে মাদুরোর আটকাবস্থার ছবি প্রকাশ করেছেন। পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি ভেনেজুয়েলায় ন্যায্যভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগপর্যন্ত সরকার পরিচালনার এবং ভেনেজুয়েলার তেলখনিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানিগুলোকে পাঠানোর ঘোষণা দেন।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে চোখ বাঁধা, কানে হেডফোন লাগানো, হাতে হাতকড়া ও কোমরে বেঁধে এক রাষ্ট্রের বৈধ প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়া—এই দৃশ্য কি মানবতা ও মানবাধিকার দৃষ্টান্ত বহন করে? নাকি মধ্যযুগীয় কোনো সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের দৃশ্য? দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো, এটি আজকের তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর এক ভয়ংকর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মূর্ত প্রতীক। এই দৃশ্য সরাসরি ক্ষমতা বদলের ঘোষণা শুধু লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক বিশ্বের জন্য একটি অশনিসংকেত ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তারা মাদুরোকে ছাড়বে না, এমনকি ততদিন দেশটির শাসনভারও কার্যত তারাই দেখভাল করবে—অনেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো।
একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে এভাবে আটক করার ঘটনা নজিরবিহীন। তবে এই হামলা ও গ্রেপ্তার ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মাসের তীব্র চাপ প্রয়োগের ধারাবাহিকতারই অংশ। গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলার উপকূলে বড় আকারের নৌবহর মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে নৌযানে বিমান হামলা চালানো হয় এবং ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার অপরাধী চক্র ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’সহ কয়েকটি গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ক্যারিবীয় সাগরে কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু হয়। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল ট্যাংকার জব্দ এবং দেশটির চারপাশে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়।
মূলত ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখলের উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়েছে বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ভেনেজুয়েলার ওপর চালানো এই বিমান হামলা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের উদ্ধত আচরণের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন আবারও নগ্ন শক্তির আশ্রয় নিয়েছে। এই আগ্রাসন দেশটির জনগণের স্বাধীন ইচ্ছা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি আঘাত। এই হামলায় ভেনেজুয়েলার কারাকাস ও দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীনতার সর্বজনস্বীকৃত নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। এ ধরনের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলবে এবং লাখ লাখ ভেনেজুয়েলাবাসীর জীবন বিপন্ন করবে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।
(লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক) ই-মেইল : [email protected]
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ ]