চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় কয়েকটি বসতঘরে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৭জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ডিসেম্বর ২০২৫ চট্টগ্রাম জেলার রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় গভীর রাতে কিছু দুর্বৃত্ত কয়েকটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ ঘটায়। এর ফলে কিছু বসতঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং কিছু বসতঘর একেবারে ভস্মিভূত হয়। অগ্নিসংযোগের ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি ব্যানার উদ্ধার করা হয়। ব্যানারগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়।
রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিতভাবে ব্যানার টানিয়ে বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোকে প্রাথমিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক হিসেবে ধরা হয়।
জেলা পুলিশ আরও জানায়, ঘটনার তদন্ত ও জড়িতদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে তথ্য-উপাত্ত, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গত ২ জানুয়ারি দুপুর আনুমানিক সাড়ে বারোটায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কলেজ গেট এলাকা থেকে ঘটনায় জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় তার বসতঘর তল্লাশি করে ৩টি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়, যা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকরা ব্যানারের সাথে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে।
গ্রেপ্তার করা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে, সে রাঙ্গামাটির লোকমান, রাঙ্গামাটির পৌরসভার সাবেক কমিশনার ও রাউজানের একজন ব্যক্তির পরিকল্পনায় ১৫/১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতঘরে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা করে। পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তি ও ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রমূলক ব্যানার টানিয়ে রাখে।
তদন্তে পুলিশ আরও জানতে পারেন, এসব ঘটনার মাধ্যমে একদিকে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা এবং অপরদিকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার আসামি মনিরের পারিবারিক বিরোধ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে ব্যানারে কিছু ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বরও সংযুক্ত করা হয়।
গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন, মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান, মোঃ পারভেজ।
ঘটনাস্থল ও আসামিদের হেফাজত হতে উসকানিমূলক ব্যানার-৪টি, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত কেরোসিন তেলের কন্টেইনার-২টি, কেরোসিন তেলমাখা লুংগি-১টি, তৈলমাখা পুরাতন কালো শার্ট-১টি, খালি প্লাস্টিকের বস্তা-৩টি, সংরক্ষিত মোবাইল ফোন-১টি, সিএনজি চালিত অটোরিকশা-১টি ও মোটরসাইকেল-১টি উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্ব প্রদানকারী একজন স্থানীয় নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সমন্বয়কারী রাঙ্গামাটিতে বসবাসকারী একজন, অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ঘটনাস্থলে যাতায়াত ও সহায়তা প্রদান করে অগ্নিসংযোগের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেপ্তার হওয়া মনির ইতোমধ্যে ঘটনার দায় স্বীকার করে বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসাব হাবীব পলাশ ও জেলা পুলিশ সুপার নজীর আহমেদ খাঁন উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সুপার বলেন, অগ্নিসংযোগ, উসকানি ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে এবং এ ধরনের অপরাধে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ বদ্ধপরিকর।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন