আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রচেষ্টা আরও জোরালো করতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) যোগ দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউরোপীয় দেশগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও তিনি এ ইস্যুতে চাপ বাড়াতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার(২০জানুয়ারি) নিজের প্রথম মেয়াদের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে বক্তব্য দেওয়ার পর বুধবার দাভোসে পৌঁছান ট্রাম্প। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা নিয়ে আলোচনার জন্য বিশ্ব নেতারা যেখানে সমবেত হন, সেখানে এবারের সম্মেলনেও ট্রাম্পই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
২০জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, দাভোসে তিনি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বৈঠক করবেন এবং শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি সমাধানে পৌঁছাব বলে মনে করি, যেখানে ন্যাটোও সন্তুষ্ট থাকবে এবং আমরাও সন্তুষ্ট থাকব। কিন্তু নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড আমাদের প্রয়োজন জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এটি জরুরি।
গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে তিনি কতদূর যেতে প্রস্তুত?এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প রহস্যজনকভাবে বলেন, ‘আপনারা দেখবেন।’
দাভোস সফরের আগে থেকেই ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন, রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। এ দাবির বিরোধিতা করলে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধের হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং সে দেশের তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ট্রাম্প কিউবা, কলম্বিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেছেন। গ্রিনল্যান্ড দখলে প্রয়োজনে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি। উল্লেখ্য, গ্রিনল্যান্ডে বর্তমানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
রয়টার্সকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের আগ্রহের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ১৯৫৯ সালে আলাস্কা ও হাওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯তম ও ৫০তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার পর এটিই হবে সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক সম্প্রসারণ।
ন্যাটোর শীর্ষ নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের কৌশল জোটের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। এমনকি ট্রাম্প এই ইস্যুকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষোভের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।
কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে ট্রাম্প সম্প্রতি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তার পাঠ্য প্রকাশ করেন। ওই বার্তায় ম্যাক্রোঁ দাভোসের পর প্যারিসে জি–৭ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান এবং গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে লেখেন, ‘গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আপনি কী করছেন, আমি তা বুঝতে পারছি না।’ ট্রাম্প ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ানোর নানা প্রস্তাব দিলেও তাতে সন্তুষ্ট হননি ট্রাম্প। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একটি সম্পাদিত ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তাকে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন পতাকা পুঁততে দেখা যায়। দ্বীপটির জনসংখ্যা প্রায় ৫৭ হাজার।
দাভোসে আবাসন পরিকল্পনা উন্মোচনের ঘোষণা
দাভোস সফরের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরতে চান। বুধবারের মূল বক্তৃতায় তিনি দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন, যদিও জনমত জরিপে তার অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আবাসন খরচ কমাতে ট্রাম্প একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করবেন, যার আওতায় নাগরিকরা বাড়ি কেনার ডাউন পেমেন্ট হিসেবে তাদের ৪০১(কে) অবসর সঞ্চয়ের অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন।
এক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবাসন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ তুলে ধরবেন, তার অর্থনৈতিক কর্মসূচির সাফল্য ব্যাখ্যা করবেন এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে স্থবিরতা সৃষ্টিকারী নীতিমালা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাবেন।
দাভোসে অবস্থানকালে ট্রাম্প সুইজারল্যান্ড, পোল্যান্ড ও মিসরের নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন। বৃহস্পতিবার তিনি ‘বোর্ড অব পিস’ নামের একটি উদ্যোগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন, যার লক্ষ্য ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে গাজা পুনর্গঠন।
গাজার বাইরে অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটেও এই বোর্ড কাজ করতে পারে এমন মন্তব্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ ঐতিহ্যগতভাবে এ দায়িত্ব জাতিসংঘ পালন করে থাকে। মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, তিনি জাতিসংঘকে পছন্দ করেন, তবে সংস্থাটি তার সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার কখনোই করতে পারেনি।
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার রাতেই ওয়াশিংটনে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। রয়টার্স
রিপোটার্স ২৪/এসসি