স্পোর্টস ডেস্ক: বাড়ির কাছেই একটা মাঠ আছে। সেখানেই গিয়ে নিজের মতো করে ফিটনেস ধরে রাখার চেষ্টা করছি। কবে আবার খেলা শুরু হবে, সেটার কোনো খবরই নেই।’
এই কথাগুলো শুনে কারও মনে হতে পারে, হয়তো কোনো ঘরোয়া ক্রিকেটারের হতাশার গল্প। কিন্তু বাস্তবতা আরও বেদনাদায়ক। এই বক্তব্য এসেছে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত ১৫ সদস্যের দলে থাকা এক ক্রিকেটারের কাছ থেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলেও, তার কথায় ফুটে উঠেছে দেশের ক্রিকেটের বর্তমান স্থবির বাস্তবতা।
এই সময়টাতে বাংলাদেশের ক্রিকেট দল থাকার কথা ছিল ভারতের বেঙ্গালুরুতে। সেখানে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে মূল টুর্নামেন্টে নামার কথা ছিল টাইগারদের। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) দল পাঠাতে রাজি না হওয়ায় আইসিসি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে না থাকা শুধু একটি দলের ব্যর্থতা নয়, বরং পুরো দেশের ক্রিকেট কাঠামোর ওপর নেমে এসেছে এক ধরনের ধাক্কা।
বিশ্বকাপে দলে থাকা একাধিক ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেউ বর্তমানে গ্রামের বাড়িতে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ আবার ঢাকায় ব্যক্তিগত অনুশীলনে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেটিও যে কতটা নিয়মিত বা কাঠামোবদ্ধ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এই স্থবিরতার বাস্তব চিত্র দেখা গেছে গতকাল মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গিয়ে। দুপুর ১২টার দিকে জাতীয় দলের প্রস্তুতির জন্য পরিচিত একাডেমি মাঠে ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা। কোনো নেট সেশন নেই, নেই ফিটনেস ট্রেনিং, নেই ক্রিকেটারদের চেনা ব্যস্ততা। মাঠে কেবল কয়েকজন গ্রাউন্ডসম্যানকে ঘাস কাটতে দেখা গেছে। এমন দৃশ্য মিরপুরে খুবই বিরল।
শুধু একাডেমি মাঠ নয়, পুরো মিরপুর জুড়েই ছিল ক্রিকেটারশূন্য পরিবেশ। এমনকি বিসিবি ভবনেও স্বাভাবিক দিনের মতো কোনো ব্যস্ততা চোখে পড়েনি। কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের ক্রিকেটের গতি কমে যাওয়ায় তাদের কাজের চাপও কমে গেছে। এক বিসিবি পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সবাই এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকেই তাকিয়ে আছে। একেকজনের একেক হিসাব। নির্বাচনের পরই সব পরিষ্কার হবে। তাই আপাতত সবাই একটু চুপচাপ।
ক্রিকেট যে পুরোপুরি থেমে গেছে, তা নয়। পূর্বাচলে ন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গতকাল শুরু হয়েছে সিসিডিএম চ্যালেঞ্জ কাপ টি-টোয়েন্টি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিসিবির কয়েকজন পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। তবে এই আয়োজনও মূলত চলমান অচলাবস্থার মধ্যে ক্রিকেটকে somehow চালু রাখার এক ধরনের চেষ্টা। ক্লাবগুলোর বয়কটের কারণে ঘরোয়া ক্রিকেট দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তায়। প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে এবার আটটি ক্লাব অংশ নেয়নি। খেলোয়াড়দের দাবির মুখে সেই দলগুলোর ক্রিকেটারদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট।
এই অনিশ্চয়তা শুধু প্রথম বিভাগেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে অস্থিরতা শুরু হয়েছে বিসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনের পর থেকেই। বোর্ডকে ‘অবৈধ’ দাবি করে ৪৮টি ক্লাব তাদের অধীনে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট হচ্ছে প্রায় অর্ধেক ক্লাব ছাড়া। এর প্রভাব পড়েছে দেশের সবচেয়ে বড় ঘরোয়া আসর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও, যেখানে ১২ ক্লাবের মধ্যে ৯টিই বয়কটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এই অনিশ্চয়তার চাপ সরাসরি গিয়ে পড়েছে ক্রিকেটারদের ওপর। বিপিএল চলাকালীন সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় দলের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত নিজেই স্বীকার করেছিলেন, দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত। এমনকি পরবর্তী ম্যাচ কবে, সেটাও ঠিকমতো মনে করতে পারেননি।
জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের কথা বিবেচনায় রেখে নতুন কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজনের ভাবনা চলছে বলে জানিয়েছেন বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির ম্যানেজার আবু ইনাম মোহাম্মদ কায়সার। তার ভাষায়, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগকে আমরা একটু ভিন্নভাবে আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু এখন যেহেতু জাতীয় দল বিশ্বকাপে যাচ্ছে না, তাই সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে।
বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের ওয়ানডে সংস্করণের ম্যাচ আয়োজন করা হবে। আর এপ্রিল মাসে মাঠে গড়াবে চার দিনের ম্যাচগুলো।
বিশ্বকাপ যখন বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট উন্মাদনার উৎসব, তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সময় কাটছে অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর নিজ নিজ উদ্যোগে ফিটনেস ধরে রাখার লড়াইয়ে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম