আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
জি ৭ শীর্ষ সম্মেলনের কাউন্টডাউন শুরু হলেও ভারতের অনুপস্থিতি এখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়ে উঠেছে। কানাডার আলবার্টা প্রদেশের কানানাসকিসে ১৫ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য ভারতকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যদি আমন্ত্রণ আসন্ন দিনগুলোতেও না আসে, তবে ২০১৯ সালের পর এই প্রথমবারের মতো ভারতের পক্ষ থেকে শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণে বিরতি পড়বে।
২০১৯ সালের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জি৭-এর প্রতিটি সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। যদিও ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে সম্মেলনটি মহামারির কারণে বাতিল হয়েছিল, তারপর মোদি ভার্চুয়ালি ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের সম্মেলনে, সরাসরি ২০২২ সালে জার্মানিতে, ২০২৩ সালে জাপানে এবং ২০২৪ সালে ইতালিতে অংশ নেন।
ভারতের এই অনিশ্চিত অবস্থানের পেছনে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে কানাডার সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
২০২৩ সালে তৎকালীন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন, যেখানে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশে খালিস্তানি নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ডে ভারতের "সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা"র কথা বলা হয়। ভারত এই অভিযোগকে "অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত" বলে প্রত্যাখ্যান করে, যার ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যাপকভাবে খারাপ হয়ে পড়ে।
জি ৭ সম্মেলনে আয়োজক দেশ সাধারণত কিছু দেশকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। এবার কানাডা ইউক্রেন এবং অস্ট্রেলিয়াকে ইতোমধ্যেই আমন্ত্রণ জানিয়েছে, কিন্তু ভারতের নাম এখনো সেই তালিকায় নেই। অন্যান্য সম্ভাব্য অতিথি দেশের তালিকা এখনও প্রকাশ পায়নি।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে পাঁচবার জি৮ সম্মেলনে অংশ নেন। ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পর রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হলে জি ৮ পুনরায় জি৭-এ রূপান্তরিত হয়। ২০২০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জি৭-কে "অপ্রাসঙ্গিক ও পুরনো কাঠামো" হিসেবে অভিহিত করে এতে ভারতসহ অন্যান্য রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছিলেন। যদিও সেই প্রস্তাব কার্যকর হয়নি, তবে ভারতকে আউটরিচ পার্টনার হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখা হয়েছিল।
এই বছর, ২৫ মে তারিখে কানাডার নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এটি ছিল মার্ক কার্নির নতুন প্রশাসনের অধীনে দুই দেশের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ। ফোনালাপে উভয় পক্ষই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আগ্রহ প্রকাশ করে।
এক সাক্ষাৎকারে আনন্দ জানান, ভারত-কানাডা সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে তার সরকার প্রস্তুত, যদিও নিজ্জার হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত তদন্ত এখনো চলমান। তিনি বলেন, "আমরা অবশ্যই এটিকে এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছি। আইনের শাসন আপসহীন, এবং তদন্ত চলছে। কিন্তু একই সঙ্গে, আমরা পারস্পরিক অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখতে আগ্রহী — এটি আমাদের বৈচিত্র্যকরণ কৌশলেরই অংশ।"তবে শীর্ষ সম্মেলনের সময়সীমা এবং প্রোটোকল বিবেচনায়, এমনকি এখন আমন্ত্রণ এলেও ভারতের অংশগ্রহণ অত্যন্ত অনিশ্চিত। সাধারণত প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানের সফরের আগে নিরাপত্তা এবং সমন্বয় দল আগাম সফর করে এবং ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এখন মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকায়, আমন্ত্রণ এলেও মোদির সম্মেলনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা ক্ষীণ।এই অনুপস্থিতি শুধু ভারত-কানাডা সম্পর্কে টানাপোড়েনের প্রতিফলন নয়, বরং ভারত-প্রধান ইউরোপ-আমেরিকান নেতৃত্বাধীন জোটগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবস্থান ও গতি প্রকৃতির একটি নতুন ইঙ্গিতও বটে। আগামী দিনগুলোতে আমন্ত্রণ আসে কিনা এবং ভারত কীভাবে এই অনুপস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে, সেটিই এখন কূটনৈতিক মহলের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।