আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : ভারত ও আমেরিকার মধ্যে একটি বড়সড় বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এক দীর্ঘ ফোনালাপের পর ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ হ্যান্ডেলে এই খবরটি জনসমক্ষে আনেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পোস্টের পরপরই ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ও পীযূষ গোয়েলও চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদীও একটি সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায় ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে জানিয়েছেন যে, ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।যদিও দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সমঝোতাকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখাচ্ছেন, তবে সরকারিভাবে কোনো বিশদ প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্র প্রকাশ না করায় বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম হয়েছে। ভারত ও আমেরিকার মধ্যে স্বাক্ষরিত এই নতুন বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সোমবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরই নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ‘আত্মসমর্পণের’ অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে বিরোধী দলগুলো। বিশেষ করে শুল্ক নীতি, জ্বালানি ক্রয় এবং কৃষি বাজারের ওপর আমেরিকার প্রভাব বৃদ্ধির আশঙ্কায় নয়াদিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।
রুশ তেল ও জ্বালানি নীতি: ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ভারত রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ করে আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি আমদানিতে সম্মত হয়েছে। এতদিন ভারত তার জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাজারদরের দোহাই দিয়ে রুশ তেল কেনার পক্ষ নিলেও, এই চুক্তিতে ভারতের অবস্থান পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ ও প্রভাব নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
৫০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রতিশ্রুতি : সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো ট্রাম্পের দাবি করা ৫০০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি প্রতিশ্রুতি। ট্রাম্পের মতে, ভারত আমেরিকা থেকে প্রযুক্তি, কৃষি ও জ্বালানি মিলিয়ে এই বিপুল অংকের পণ্য কিনতে রাজি হয়েছে। বর্তমানে আমেরিকা থেকে ভারতের বার্ষিক আমদানি ৫০ বিলিয়ন ডলারের কম। আগামী অর্থবর্ষের ভারতের মোট বাজেটের (৫৩.৫ লক্ষ কোটি টাকা) তুলনায় এই প্রতিশ্রুতি প্রায় সমান (৪৫.৫ লক্ষ কোটি টাকা)। ভারত এই বিপুল অর্থ কোথা থেকে জোগাবে এবং এর বিনিময়ে মহাকাশ বা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ছাড় পাবে কি না, তার কোনো উত্তর মেলেনি।
কৃষি ও শূন্য শতাংশ শুল্ক: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভারত মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনবে। মার্কিন কৃষিমন্ত্রী ব্রুক রোলিন্স একে আমেরিকার গ্রামীণ অর্থনীতির জয় হিসেবে দেখলেও, ভারতীয় কৃষকদের জন্য এটি বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ মার্কিন কৃষিপণ্য বিনা শুল্কে বাজারে ঢুকলে স্থানীয় চাষিরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন।
তথ্যের অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির যুগে ভারতীয় তথ্য আমেরিকার সংস্থাগুলোর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। চুক্তিতে কি ভারতীয়দের ব্যক্তিগত তথ্য বিনিময়ের কোনো গোপন শর্ত রয়েছে? এই বিষয়েও সরকারি স্তরে কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি। মেধা সত্ত্ব ও স্থানীয় বাজারের প্রতিযোগিতা সম্প্রতি ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে চুক্তিতে ভারত মেধা সত্ত্বের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় হয়েছে। আমেরিকার সাথে চুক্তিতে ওষুধ শিল্পের মতো স্পর্শকাতর খাতে কী আপস করা হয়েছে, তা এখনও অজানা। পাশাপাশি, ১৮% শুল্ক হওয়ার পরও পাকিস্তান (১৯%) বা বাংলাদেশের (২০%) তুলনায় ভারত খুব একটা বড় সুবিধা পাবে না বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বর্তমানে সংসদের বাজেট অধিবেশন চলায় বিরোধীরা দাবি করেছেন যে, অবিলম্বে ভারত-আমেরিকা এবং ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি সংসদে পেশ করতে হবে। মার্কিন কৃষিমন্ত্রীর ‘ভারতীয় কৃষি বাজার উন্মুক্ত হওয়ার’ দাবি ঘিরে যে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার দাবি জানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো। মধ্যবিত্ত বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবার মনেই এখন প্রশ্ন, এই চুক্তি কি সত্যিই ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি ও শিল্পকে রক্ষা করতে পারবে, নাকি এটি কেবল একতরফা সমঝোতা হয়েই থেকে যাবে।চুক্তির ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এল যখন ট্রাম্প ও মোদী—উভয় নেতাই ‘এপস্টাইন ফাইল’ এবং গৌতম আদানি সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। বিশদ কোনো সরকারি নথি ছাড়া শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের ওপর ভিত্তি করে হওয়া এই চুক্তিটি আদৌ দীর্ঘমেয়াদে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ ]
রিপোর্টার্স২৪/এসসি