আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার ওমানের রাজধানী মাস্কাটে অনুষ্ঠেয় এই আলোচনাকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও আলোচনার এজেন্ডা নিয়ে দুই পক্ষের গভীর মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ থাকায় অগ্রগতি কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
দুই দেশই ইরানের দীর্ঘদিনের পরমাণু সংকট নিয়ে কূটনৈতিক পথে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও যুক্তরাষ্ট্র চায় আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং ‘নিজ দেশের জনগণের সঙ্গে আচরণ’ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হোক। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ কথা বলেন।
অন্যদিকে, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, মাস্কাটে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে কেবল পরমাণু ইস্যুতেই আলোচনা করতে চায় তারা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে এই আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠকের আগে শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় আরাঘচি বলেন, খোলা চোখে এবং গত বছরের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই ইরান কূটনীতিতে প্রবেশ করছে। আমরা সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনা করি এবং আমাদের অধিকার রক্ষায় দৃঢ় থাকি। প্রতিশ্রুতি অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সমান মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও পারস্পরিক স্বার্থ এগুলো কোনো অলংকারমূলক কথা নয়; টেকসই চুক্তির ভিত্তি হিসেবেই এগুলো অপরিহার্য।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায়, যা ইসরায়েলের ১২ দিনব্যাপী বিমান অভিযানের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত হয়। এর পর থেকে ইরান দাবি করে আসছে, তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।
তবে ইরানের নেতৃত্ব এখনো উদ্বিগ্ন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার হুমকি অনুযায়ী সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। বিশেষ করে ইরানের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বড় ধরনের উপস্থিতি এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ট্রাম্প এই নৌসমাবেশকে ‘বিশাল আর্মাডা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ইরানে গত মাসে দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমনে সরকারের রক্তক্ষয়ী অভিযানের পরই যুক্তরাষ্ট্রের এই নৌসমাবেশ জোরদার হয়, যা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেখতে চান আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব কি না। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্কবার্তাও দেন।
লেভিট বলেন, এই আলোচনা চলাকালেই আমি ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্টের হাতে কূটনীতির বাইরে আরও অনেক বিকল্প রয়েছে।
চুক্তিতে পৌঁছানো না গেলে ‘খারাপ কিছু’ ঘটতে পারে এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ট্রাম্প। এর ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার হুমকিতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ইরান আগেই জানিয়েছে, কোনো সামরিক হামলা হলে তারা কঠোর জবাব দেবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এমন প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, হামলায় জড়িত হলে তারাও পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক এফডিডির (Foundation for Defense of Democracies) সিনিয়র ফেলো এডমন্ড ফিটন-ব্রাউন বলেন, আগামীকালের আলোচনায় ইরান এতটা ছাড় দেবে এমনটা দেখা কঠিন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্যভাবে এটিকে বড় কোনো সাফল্য বলে দাবি করতে পারে। এখানেই সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে হচ্ছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যু
ওমানে আলোচনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে তাদের ‘রেড লাইন’। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা তাদের ‘প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও এর পাল্লা’ নিয়ে কোনো আলোচনা করবে না।
আলোচনার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে দেশের অন্যতম উন্নত দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খোররামশাহর–৪’ মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে কিছুটা নমনীয়তা দেখাতে পারে ইরান। ইরানি কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে রয়টার্সকে জানান, সমাধানের অংশ হিসেবে ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এইচইইউ) হস্তান্তর করা এবং কোনো কনসোর্টিয়াম ব্যবস্থার আওতায় শূন্য সমৃদ্ধকরণ মেনে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে তেহরান। তবে একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
ইরানের দাবি, তাদের পরমাণু কার্যক্রম পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অতীতে ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ করে আসছে।
এদিকে, গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি ও ইরাকে মিলিশিয়াসহ ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত ইরানঘেঁষা গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইসরায়েলের হামলা এবং সিরিয়ায় ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর আঞ্চলিকভাবে তেহরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি