আশিস গুপ্ত
ভারতের প্রথম সারির গাড়ি নির্মাতা সংস্থাগুলোর যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ‘সেফ ইন ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ক্রাশড ২০২৫’-এ উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠা ছবি।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৭,০০০ আহত শ্রমিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অটোমোবাইল সেক্টরে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার হার কমছেই না, বরং এক ভয়াবহ স্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রতিবেদনের সবচেয়ে আতঙ্কজনক তথ্য হলো, এই সেক্টরে হওয়া দুর্ঘটনার ৭৫ শতাংশই ঘটে ‘পাওয়ার প্রেস’ মেশিনে এবং গড়ে প্রতি দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিক তাঁর দুটি আঙুল হারান। গত ছয় বছরে এই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ গুরুতর জখম হওয়ার ঘটনা ঘটছে ছোট ও মাঝারি মাপের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশই ঘটছে কারখানার ভেতরে রুটিন কাজ চলাকালীন। অথচ অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ এই দুর্ঘটনাগুলোকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে আইনি জটিলতা এড়াতে।
হরিয়ানার মতো রাজ্যে ৮৭ শতাংশ এবং মহারাষ্ট্রে ৬২ শতাংশ আহত শ্রমিকই পরিযায়ী। এঁদের বড় অংশই অস্থায়ী চুক্তিতে কাজ করেন এবং দশম শ্রেণির গণ্ডি পার করেননি। হিউম্যান রাইটস অ্যাডভোকেট শালিনী গেরার মতে, এই আঘাতের বোঝা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির ওপরেই এসে পড়ছে।
এমনকি কারখানায় অদক্ষ ‘হেল্পার’দের দিয়ে অবৈধভাবে বিপজ্জনক মেশিন চালানো হচ্ছে, যা বড় দুর্ঘটনার মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত লেবার কোড বা শ্রম আইনগুলো যে কেবল খাতায়-কলমে সীমাবদ্ধ, তার প্রমাণও মিলেছে এই রিপোর্টে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ শ্রমিক সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, যার মধ্যে ২২ শতাংশ শ্রমিকের কাজের সময় সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টারও বেশি। অধিকাংশ শ্রমিককে ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম টাকা দেওয়া হয় এবং ৯৭ শতাংশ শ্রমিকের হাতে কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র নেই।
কারখানার পরিকাঠামো এতটাই জরাজরজ যে, ৯০ শতাংশ মেশিনে কোনো সুরক্ষাকবচ বা সেন্সর নেই। অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও সুপারভাইজাররা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চাপে ত্রুটিপূর্ণ মেশিন সারাই করেন না।
দুর্ঘটনার তথ্য গোপনের এক প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্তও ধরা পড়েছে এই রিপোর্টে। হরিয়ানায় সরকারি তথ্যের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি আহত শ্রমিককে সহায়তা দিয়েছে এসআইআই। এর অর্থ হলো, সরকারি নথিতে বিশাল সংখ্যক দুর্ঘটনা নথিভুক্তই করা হয় না।
অনেক ক্ষেত্রে আহত হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে শ্রমিকের বিমা বা ইএসআইসি কার্ড তৈরি করা হয়, যা আগে থেকেই থাকার কথা। মহারাষ্ট্রে ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে জখম হওয়ার পর শ্রমিকরা তাঁদের বিমা কার্ড হাতে পেয়েছেন।
এই অনিরাপদ কাজের পরিবেশ কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, এটি ভারতের অর্থনীতিরও বড় ক্ষতি করছে। এসআইআই-এর হিসেব অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবে ভারত প্রতি বছর ১২.৫ লক্ষ কোটি টাকা (জিডিপির প্রায় ৪.২ শতাংশ) হারায়। উৎপাদনশীলতা এবং চিকিৎসার খরচ মিলিয়ে এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতি হচ্ছে।
মারুতি সুজুকি, টাটা মোটরস বা মাহিন্দ্রার মতো প্রথম সারির ১০টি কোম্পানি তাদের প্রথম স্তরের সরবরাহকারীদের ওপর নজর দিলেও, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের ছোট কারখানগুলোতে নিরাপত্তার বালাই নেই।
‘সেফ ইন ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’-এর সিইও সন্দীপ সচদেবার মতে, গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস বা বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য কর্তব্য।
লেখক: ভারতীয় সিনিয়ির সাংবাদিক
[ আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ ]