রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো রোজা। রোজা বা সিয়াম আত্মনিয়ন্ত্রণ, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের এক অনন্য ইবাদত। রোজার শাব্দিক অর্থ ‘বিরত থাকা’। শরিয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, যৌন সম্পর্কসহ সব ধরনের ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থাকাই হলো রোজা।
হাদিস শরিফে এসেছে, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, আল্লাহ তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।- (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০১)
রমজান মাসে আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। এ মাসে রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৭৯)।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- হে ইমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।-(সূরা বাকারা: ১৮৩)
এই পবিত্র মাসে মুমিন জীবনে কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় রয়েছে, যা যথাযথভাবে পালন করলে রমজান হবে সার্থক ও অর্থবহ।
রমজানে করণীয় আমল
১. কোরআনুল কারিম তেলাওয়াত
রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের প্রতিটি রাতে হজরত জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে কোরআন দাওর করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০২)। তাই এ মাসে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা বিশেষ ফজিলতের কাজ।
২. তারাবির নামাজ আদায়
রমজানের রাতের বিশেষ ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় তারাবি আদায় করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।- (বুখারি)
৩. বেশি বেশি দান-সদকা
রমজানে দান-সদকার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। হাদিসে এসেছে, রমজানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দানশীলতা প্রবাহমান বাতাসের চেয়েও বেশি হতো (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০২)।
৪. নফল ইবাদতে মনোনিবেশ
রমজানে শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে। তাই ইশরাক, চাশত, তাহাজ্জুদসহ বিভিন্ন নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ থাকে।
৫. ইফতার করা ও ইফতার করানো
দ্রুত ইফতার করা সুন্নত। খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করা উত্তম। রোজাদারকে ইফতার করালে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ হয় (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৭৪৬)।
৬. তাওবা ও মাগফিরাত কামনা
রমজান ক্ষমা পাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। বিশেষ করে ইফতার ও তাহাজ্জুদের সময় বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করা উচিত।
৭. শবে কদর অন্বেষণ
শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম রাত লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করা মুমিনের কর্তব্য (সূরা কদর: ১-৫)।
৮. ইতিকাফ
রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা রাসুল (সা.)-এর নিয়মিত আমল ছিল (বুখারি, হাদিস: ২০২১)।
৯. ফিতরা আদায়
রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণে ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা আবশ্যক (বুখারি, হাদিস: ১৫০৩)।
১০. সামর্থ্য থাকলে ওমরাহ
রমজানে একটি ওমরাহ হজের সমতুল্য সওয়াবের অধিকারী (বুখারি, হাদিস: ১৮)।
রমজানে বর্জনীয় কাজ
১. তথাকথিত ‘ইফতার পার্টি’র নামে বেহায়াপনা
ইসলামে পর্দা ফরজ। নারী-পুরুষ বেপর্দা মেলামেশার মাধ্যমে ইফতার আয়োজন ইসলামসম্মত নয়।
২. রমজানে ব্যবসায়িক শোষণ
নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মারাত্মক গুনাহ। রাসুল (সা.) বলেন, খাদ্য গুদামজাতকারী আল্লাহর গজবে পতিত হয় (ইবনে মাজাহ)।
৩. অনর্থক কথা ও বাজে আচরণ
মন্দ কথা ও আচরণ রোজার সওয়াব নষ্ট করে দেয় (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬৯০)।
৪. ঝগড়া-বিবাদ ও অশ্লীলতা
রোজাদারকে গালি-গালাজ, গান-বাজনা ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকতে হবে।
৫. অধীনস্থদের ওপর কাজের বোঝা বাড়ানো
রমজানে রোজাদার কর্মীদের কাজ হালকা করে দেওয়া উত্তম আমল (ইবনে খুজাইমা)।
৬. গিবত
গিবত আমল ধ্বংসের নীরব ঘাতক- এ থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
৭. অপচয় ও অপব্যয়
অপব্যয়কারীকে কোরআনে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে।
৮. রিয়া বা লোকদেখানো ইবাদত
রিয়া ছোট শিরক। এ থেকে বেঁচে থাকা ঈমানের দাবি।
৯. মিথ্যা পরিহার
মিথ্যাচার রোজার উদ্দেশ্য নষ্ট করে দেয় (বুখারি, হাদিস: ১৯০৩)।
১০. বিদয়াত থেকে বিরত থাকা
লাইলাতুল কদর শুধু ২৭ রমজানে সীমাবদ্ধ নয়। বিদয়াত পরিহার করে সুন্নাহ অনুযায়ী শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে ইবাদত করা কর্তব্য।
দোয়া
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের রোজা যথাযথভাবে আদায় করার, করণীয় আমলে যত্নবান হওয়ার এবং বর্জনীয় কাজ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
রিপোর্টার্স২৪/আরকে