আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওমানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনার পর দেশটিতে সফরে পৌঁছেছেন ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
আলী লারিজানি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল) সচিব এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। মঙ্গলবার ওমানের রাজধানী মাসকাটে পৌঁছে তিনি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদির সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক আল সাইদের সঙ্গেও তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পারমাণবিক আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন।
ইরনা জানিয়েছে, লারিজানির সফরে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি ইরান ও ওমানের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়টিও আলোচনার তালিকায় রয়েছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান, বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন,ওমানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনা ও তার পরপরই লারিজানির এই সফর আলোচনায় অগ্রগতির ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ওমানে যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, তার লক্ষ্য ছিল ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত এড়িয়ে চলা। ওই আলোচনার প্রেক্ষাপটে অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধ এড়াতে আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই অংশ ছিল এই আলোচনা। আলোচনার দ্বিতীয় দফা নিশ্চিত হলেও এখনো তার তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
এদিকে ইরনা আরও জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মঙ্গলবার তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনালাপে ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেছেন।
ইউরেনিয়াম পাতলা করার ইঙ্গিত তেহরানের
আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়ে দুই পক্ষ থেকেই মিশ্র বার্তা পাওয়া গেলেও সোমবার ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়, তবে তেহরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাতলা (ডাইলিউট) করতে রাজি হতে পারে।
ইরনা জানায়, বর্তমানে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা অস্ত্র-মানের (৯০ শতাংশ) খুব কাছাকাছি। এসলামির ভাষায়, এই ইউরেনিয়াম পাতলা করার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নির্ভর করবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ওপর।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই ইরানের সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন, যা তেহরান স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওয়াশিংটন চাইছে, ইরান তাদের প্রায় ৪৪০ কেজির বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করুক,জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা গত বছর এমনই হিসাব দিয়েছিল।
রোববার তেহরানে এক কূটনৈতিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পুনর্ব্যক্ত করেন, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার ছাড়বে না।
আল জাজিরার প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন পারমাণবিক ইস্যুর পাশাপাশি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাবকেও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। অন্যদিকে তেহরান চাইছে আলোচনা কেবল পারমাণবিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকুক এবং ধাপে ধাপে জট খুলুক।
পরবর্তী দফা আলোচনা ও নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফর
পরবর্তী দফা আলোচনার স্থান ও সময় এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহেই নতুন দফা আলোচনা হতে পারে।
এর আগে গত বছর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচ দফা আলোচনা হয়েছিল, তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে মতবিরোধের কারণে সেগুলো অচল হয়ে পড়ে।
এরপর গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের নাতানজ, ফোরদো ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। ওই হামলার পর ইরান দাবি করে, তারা সাময়িকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
এদিকে আলী লারিজানির ওমান সফরের সময়েই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান আলোচনার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সপ্তম বৈঠক।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিতে পারেন। তবে তেহরান এই বিষয়টিকে ‘অলোচনাযোগ্য নয়’ বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
রিপোর্টার্স২৪/এসসি