রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশের বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে দলটি। দলীয় প্রধান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, এমনটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক মাসের অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর দেশ যখন পুনর্গঠনের পথে, তখন এ নির্বাচনকে স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও নিহত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর পুত্র ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানের সামনে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং তৈরি পোশাক খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোকে ঘুরে দাঁড় করানোর বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সৃষ্ট অস্থিরতায় এসব খাত বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর তথ্যমতে, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা অন্তত ২১২টি আসনে জয় পেয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট ৭০টি আসনে জয়ী হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাবে বিএনপি পেয়েছে ১৮১টি, জামায়াতে ইসলামী ৬১টি এবং অন্যান্যরা ৭টি আসন। পূর্ণাঙ্গ সরকারি ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ফলাফলের প্রবণতা স্পষ্ট হওয়ার ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হলেও তারেক রহমান এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে বিএনপি বড় ধরনের বিজয় মিছিল বা সমাবেশ না করে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করতে সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, “বড় ব্যবধানে বিজয় লাভ সত্ত্বেও কোনো আনন্দ মিছিল বা সমাবেশ আয়োজন করা হবে না।”
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কয়েকটি আসনের ফলাফল এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং চূড়ান্ত ফলাফল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঘোষণা করা হতে পারে। তবে গেজেট প্রকাশে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে, যা নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ বিলম্বিত করতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ ছাড়া সরকার শপথ নিতে পারে না।
যুব আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), যারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তারা ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র পাঁচটিতে জয় পেয়েছে। এনসিপি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ ছিল।
১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মুসলিম-প্রধান এই দেশে কয়েক মাসের প্রাণঘাতী সরকারবিরোধী বিক্ষোভে স্বাভাবিক জীবন ও শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তাই স্পষ্ট ও নিরঙ্কুশ ফলাফলকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “দৃঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে সংস্কার কার্যকরভাবে পাস করতে এবং আইন প্রণয়নে অচলাবস্থা এড়াতে সহায়তা করবে। এতে স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।”
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ঢাকার এক তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক ২৮ বছর বয়সী জোসনা বেগম বলেন, “কারখানা নিয়মিত চললে এবং আমরা সময়মতো মজুরি পেলে সেটাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি শুধু চাই বিএনপি সরকার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনুক, যাতে বেশি অর্ডার আসে এবং আমরা টিকে থাকতে পারি।”
ইতোমধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা
বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রয়টার্সকে বলেন, ওয়াশিংটন বাংলাদেশে চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।
শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যার প্রভাব পড়ে ভিসা সেবা ও দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কেও।
আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ–এর জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিন বলেন, “বাংলাদেশের জন্য এটি একদিকে সুযোগ—চারপাশে বড় শক্তিগুলো প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। আবার এটি চ্যালেঞ্জও—কীভাবে সেই সম্পর্কগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা হবে।”
জামায়াতে ইসলামী বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ফলাফলের প্রবণতা স্পষ্ট হওয়ার পর পরাজয় স্বীকার করে নেয়। তবে শুক্রবার এক বিবৃতিতে তারা জানায়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তারা “সন্তুষ্ট নয়” এবং সমর্থকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানায়। ২০১৩ সালে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবারই প্রথম নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
২০০টির বেশি আসনে জয় নিয়ে বিএনপির এই বিজয় তাদের ইতিহাসে অন্যতম বড় সাফল্য। ২০০১ সালে তারা ১৯৩টি আসন পেয়েছিল। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ২৩০টি আসনে জয় পেয়েছিল। যদিও অন্যান্য বছরের নির্বাচনগুলোয় প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন বা বিতর্ক ছিল।
এবার ভোটার উপস্থিতি ২০২৪ সালের ৪২ শতাংশের চেয়ে বেশি হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬০ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বৃহস্পতিবার ভোট দিয়েছেন।
২ হাজারের বেশি প্রার্থী, যাদের মধ্যে অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন, এবারের নির্বাচনে অংশ নেন। রেকর্ডসংখ্যক অন্তত ৫০টি দল ব্যালটে ছিল। এক আসনে প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়।
নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত সংবিধান সংস্কার বিষয়ক গণভোটে জামুনা টিভির তথ্য অনুযায়ী ২০ লাখের বেশি ভোটার “হ্যাঁ” এবং সাড়ে ৮ লাখের বেশি “না” ভোট দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর দুই মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নারীর প্রতিনিধিত্ব জোরদার, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা এবং ৩০০ আসনের সংসদের পাশাপাশি দ্বিতীয় কক্ষ গঠন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি