আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলে ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে এমন সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী;এমনটাই জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা। সংবেদনশীল পরিকল্পনার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা রয়টার্সকে এ তথ্য দেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অভিযান হলে তা দুই দেশের মধ্যে আগে দেখা উত্তেজনার তুলনায় অনেক বেশি গুরুতর সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এই প্রস্তুতির তথ্য কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী মঙ্গলবার জেনেভায় ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকবে ওমানের প্রতিনিধিরা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার কূটনৈতিক সমাধান হলেও তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো ‘খুবই কঠিন’।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে, যা নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। শুক্রবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, পেন্টাগন অঞ্চলে অতিরিক্ত একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠাচ্ছে। এর সঙ্গে হাজারো অতিরিক্ত সেনা, যুদ্ধবিমান, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হচ্ছে, যা আক্রমণ ও প্রতিরক্ষায় সক্ষম।
উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে এক সামরিক অনুষ্ঠানে শুক্রবার ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথাও তোলেন। তিনি বলেন, এটাই সম্ভবত সবচেয়ে ভালো ঘটনা হতে পারে।’ তবে কারা ক্ষমতায় আসতে পারেন—সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। তার ভাষায়, ‘মানুষ আছে। গত ৪৭ বছর ধরে তারা শুধু কথা বলেই গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে ট্রাম্প বরাবরই সংশয়ী। গত বছর তিনি বলেন, ‘শেষ যে কাজটি করতে চাই, তা হলো স্থলসেনা পাঠানো।’ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যে ধরনের সামরিক শক্তি জড়ো করা হয়েছে, তা মূলত আকাশ ও নৌবাহিনীকেন্দ্রিক হামলার ইঙ্গিত দেয়। গত মাসে ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারে বিশেষ বাহিনীর ব্যবহার করে অভিযান চালানোর দৃষ্টান্তও রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের।
সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে মন্তব্য চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘ইরান প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে সব বিকল্পই খোলা আছে।’ তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন মতামত শোনার পর জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের স্বার্থ বিবেচনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট। পেন্টাগন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে দুটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছিল। জুনে ‘মিডনাইট হ্যামার’ নামে পরিচালিত অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেলথ বোমারু বিমান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে গিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে সীমিত আকারে পাল্টা হামলা করে।
ঝুঁকি বাড়ছে
এবারের পরিকল্পনা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে কেবল পারমাণবিক স্থাপনা নয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানাননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের কাছে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার থাকায় এমন অভিযানে মার্কিন বাহিনীর ঝুঁকি অনেক বেশি হবে। পাল্টা ইরানি হামলার ফলে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়বে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রত্যাশা করছে যে ইরান পাল্টা হামলা চালাবে এবং এতে পাল্টাপাল্টি আঘাতের ধারাবাহিকতা তৈরি হতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ইস্যুতে ট্রাম্প বারবার ইরানে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি সতর্ক করে বলেন, কূটনৈতিক সমাধান না হলে বিকল্প পথ হবে ‘খুবই বেদনাদায়ক’।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড সতর্ক করে বলেছে, ইরানি ভূখণ্ডে হামলা হলে তারা যেকোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কে সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
এরই মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে তাতে ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকতে হবে।
ইরান জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তারা পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে এ ইস্যু যুক্ত করার প্রস্তাব তারা নাকচ করেছে।
শনিবার ইরানের বিরোধী ব্যক্তিত্ব রেজা পাহলভি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রাণ বাঁচাতে পারে এবং ওয়াশিংটনের উচিত তেহরানের ধর্মীয় শাসকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা না করা। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে দেশ ছাড়েন ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহর ছেলে পাহলভি দাবি করেন, ইরানি সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে এবং একটি হামলা সেই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে।
তার ভাষায়, ‘আমরা আশা করছি এই হামলা প্রক্রিয়াটি দ্রুততর করবে এবং জনগণ আবার রাস্তায় নেমে শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারবে।’
রিপোর্টার্স২৪/এসসি