আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মেক্সিকোর শীর্ষ মাদক সম্রাট নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস, ওরফে ‘এল মেনচো’, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হওয়ার পর দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গাড়িতে আগুন, মহাসড়ক অবরোধ এবং বন্দুকধারীদের তাণ্ডবে অন্তত ছয়টির বেশি রাজ্য অচল হয়ে পড়ে।
মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার পশ্চিমাঞ্চলীয় জালিস্কো রাজ্যের তাপালপা শহরে সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে আহত হন এল মেনচো। পরে তাকে মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। তার মাথার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
এই অভিযানের পরপরই জালিস্কোসহ কোলিমা, মিচোয়াকান, নায়ারিত,গুয়ানাহুয়াতো,তামাউলিপাসরাজ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলো অবরোধ করে।
জালিস্কোর রাজধানী গুয়াদালাহারা যেখানে আসন্ন FIFA World Cup-এর কয়েকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা;রোববার রাতেই প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গুয়াদালাহারা বিমানবন্দরে আতঙ্কে দৌড়াচ্ছেন যাত্রীরা, আর পর্যটন শহর পুয়ের্তো ভাল্লার্তা-এ ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে।
জালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমুস বাসিন্দাদের ঘরে থাকার আহ্বান জানান এবং গণপরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেন। কয়েকটি রাজ্যে সোমবার স্কুলও বন্ধ রাখা হয়।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সব রাজ্য সরকারের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় রয়েছে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় অভিযান
মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ‘পরিপূরক তথ্য’-এর ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে এল মেনচোর নেতৃত্বাধীন Jalisco New Generation Cartel (সিজেএনজি)-এর চার সদস্য নিহত হয়। মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার পথে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়। দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে সাঁজোয়া যান, রকেট লঞ্চারসহ বিপুল অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। তিনজন সেনা সদস্য আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ এই অভিযানে সন্তোষ প্রকাশ করে এল মেনচোকে “সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও নির্মম মাদক সম্রাটদের একজন” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের জন্য বড় অগ্রগতি।
যুক্তরাষ্ট্র জালিস্কো, তামাউলিপাস, মিচোয়াকান, গুয়েরেরো ও নিউভো লিওন রাজ্যে অবস্থানরত নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কানাডাও জালিস্কো, গুয়েরেরো ও মিচোয়াকানে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। পুয়ের্তো ভাল্লার্তায় আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নাগরিকদের।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এয়ার কানাডা পুয়ের্তো ভাল্লার্তায় ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ও আমেরিকান এয়ারলাইন্সও পুয়ের্তো ভাল্লার্তা ও গুয়াদালাহারায় ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।
এল চ্যাপো’র পর বড় আঘাত
৫৯ বছর বয়সী এল মেনচো মেক্সিকোর অন্যতম প্রভাবশালী মাদক সম্রাট ছিলেন। Joaquin Guzman ও Ismael Zambada-এর গ্রেপ্তারের পর তিনিই ছিলেন মুক্ত অবস্থায় সবচেয়ে শক্তিশালী মাদকপাচারকারী নেতা।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও অ্যাভোকাডো চাষি এল মেনচো ২০০৭ সালের দিকে সিজেএনজি গঠন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের মতে, মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা কোকেইন, হেরোইন, মেথামফেটামিন ও ফেন্টানিলের বড় অংশের পেছনে এই সংগঠন জড়িত।
বিশ্লেষকদের মতে, এল মেনচোর মৃত্যুকে সরকার তাৎক্ষণিক সাফল্য হিসেবে দেখাতে পারলেও এর ফলে নতুন করে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তার ভাই ও ছেলে—‘এল মেনচিতো’—যুক্তরাষ্ট্রে কারাবন্দি। স্পষ্ট উত্তরসূরি না থাকায় কার্টেলের আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে সংঘাত শুরু হতে পারে।
মার্কিন মাদকদমন সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা মাইক ভিজিল বলেন, শুধু কার্টেল প্রধানকে হত্যা বা গ্রেপ্তার করলেই বড় পরিবর্তন আসবে না। তাদের অবকাঠামো, অর্থপাচার নেটওয়ার্ক ও সশস্ত্র শাখার বিরুদ্ধে গোয়েন্দাভিত্তিক দ্রুত ও কার্যকর অভিযান চালাতে হবে। অন্যথায় সহিংসতা বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিবছর বিপুল অস্ত্র মেক্সিকোতে পাচার হলেও সেগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। একইভাবে মাদক চাহিদা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগও সীমিত।বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা মেক্সিকো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি