সুলতানা আইভি
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিশ্বজুড়ে আবারো বাড়তে শুরু করেছে, বিশেষ করে ভারতসহ কয়েকটি দেশে এর প্রকোপ লক্ষণীয়। নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব এই বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে সতর্কতা অবলম্বন করছে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি ও নতুন ভ্যারিয়েন্ট:
সংক্রমণ বৃদ্ধি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে সংক্রমণের সংখ্যা এখনো অনেক কম হলেও, আগের সপ্তাহের তুলনায় এটি ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে ভারতে সক্রিয় করোনা রোগীর সংখ্যা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১ হাজার ২শ' শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
নতুন ভ্যারিয়েন্ট JN.1: WHO অমিক্রনের জেএন.১ উপ-ধরণকে "গুরুত্বপূর্ণ" বলে চিহ্নিত করেছে, কারণ এটি "দ্রুত ব্যাপকভাবে বিস্তার" লাভ করছে। ভারত, চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ২২টিরও বেশি দেশে এই ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। এর সংক্রমণের হার বেশি, কারণ এটি একটি অতিরিক্ত স্পাইক প্রোটিন বহন করে।
বাংলাদেশে XFG এবং XFC: বাংলাদেশেও XFG এবং XFC নামক দুটি নতুন করোনাভাইরাস ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে, যা অমিক্রনের জেএন-১ ভ্যারিয়েন্টের উপধরন। আইসিডিডিআরবির (ICDDR,B) গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে আক্রান্তদের অধিকাংশই XFG ধরনে সংক্রমিত হচ্ছেন। যদিও এই ভ্যারিয়েন্টগুলোর সংক্রমণের ক্ষমতা বেশি, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হালকা উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।
বিভিন্ন দেশে গৃহীত সতর্কতা ও পদক্ষেপ:
করোনাভাইরাসের নতুন ঢেউ মোকাবিলায় এবং এর বিস্তার রোধে বিভিন্ন দেশ আবারও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। মূলত আগের মহামারীর অভিজ্ঞতা থেকে শেখা প্রতিরোধমূলক অভ্যাসগুলো ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মাস্ক পরিধান:
অনেক দেশে, বিশেষ করে জনসমাগমস্থল, গণপরিবহন এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মাস্ক পরার ওপর আবারো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ইউনিসেফ এবং WHO মাস্ক সঠিকভাবে পরিধান, খোলা এবং রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। মাস্ক মুখ, নাক এবং চিবুক ভালোভাবে ঢেকে রাখবে এবং পাশে কোনো ফাঁক থাকবে না তা নিশ্চিত করতে বলা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যবিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা:
হ্যান্ড স্যানিটাইজেশন: সাবান ও জল দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া অথবা অ্যালকোহল-ভিত্তিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
কাশি ও হাঁচির শিষ্টাচার: কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক টিস্যু দিয়ে ঢেকে রাখা এবং ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনাযুক্ত বর্জ্যপাত্রে ফেলে দেওয়ার অভ্যাস পুনরায় চালু করতে বলা হচ্ছে।
নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ না করা: হাত দিয়ে নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, কারণ এটি সংক্রমণের একটি সাধারণ পথ।
সামাজিক দূরত্ব ও জনসমাগম এড়ানো:
যদিও কঠোর লকডাউন বা সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ এখন বেশিরভাগ দেশে নেই, তবে অসুস্থ বোধ করলে অথবা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে অন্যদের থেকে অন্তত ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়, জনসমাগম এড়িয়ে চলার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে।
পরীক্ষা ও আইসোলেশন:
উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানোর এবং নিশ্চিত আক্রান্ত হলে বাড়িতে আইসোলেশনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এটি ভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সাহায্য করে।
যারা বিদেশ থেকে আসছেন, তাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম অনুযায়ী স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করা হতে পারে।
টিকাকরণ ও বুস্টার ডোজ:
WHO এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার强调 করছেন যে, কোভিড-১৯ এবং ফ্লু-এর টিকা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যারা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর সদস্য (যেমন বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তরা)।
অনেক দেশে টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও, মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ চিন্তিত। সরকারগুলো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বুস্টার ডোজ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে, কারণ টিকার কার্যকারিতা সাধারণত ছয় মাস পর কমে যায়।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সতর্কতা:
কিছু দেশ আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে নতুন করে স্বাস্থ্যবিধি আরোপ করতে পারে অথবা নির্দিষ্ট দেশ থেকে আগত যাত্রীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করতে পারে। যদিও বর্তমানে তেমন কোনো কঠোর বিধিনিষেধ নেই, তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মত ও ভবিষ্যৎ সতর্কতা:
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমানে ভাইরাসটির তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম হলেও, নতুন ভ্যারিয়েন্টগুলোর দ্রুত বিস্তার ক্ষমতা রয়েছে। তাই, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুবই জরুরি। তারা বলছেন, কোভিড-১৯ হয়তো কখনোই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হবে না, তাই এটিকে একটি ফ্লু-এর মতো সাধারণ অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা করে এর সাথে মানিয়ে নিয়ে চলতে হবে, তবে সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি।
বর্তমান সময়ে, ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই এই নতুন ঢেউয়ের মোকাবিলা করা সম্ভব।