এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালের পিলখানা ট্রাজেডি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি নরকযজ্ঞের দিন। ঢাকার পিলখানায় বিডিআরের বিদ্রোহের ছদ্মনাটক মঞ্চস্থ করে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। ২৫ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ওই দিন জাতি হারিয়েছিল তার সাহসী সেনা সন্তানদের। বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্য রহস্য আজও পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি। বর্তমান সরকারের ওপর প্রত্যাশা, তারা এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য এবং নেপথ্য হোতাদের পরিচয় জাতীয় জনগণের সামনে প্রকাশ করবেন।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বিডিআরের মনোবল ও চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের গৌরবময় বাহিনীকে কলঙ্কিত করা হয়। সম্ভবত বিশ্বের ইতিহাসে একদিনে এত সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনা বিরল। পিলখানা হত্যাকাণ্ড কোনো স্বাভাবিক বিদ্রোহ নয়, এটি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর পুনঃতদন্ত শুরু হয়। গঠিত হয় জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন, যার লক্ষ্য পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও জড়িতদের শনাক্তকরণ। ২০০৯ সালের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু রাজনৈতিক নেতার নাম তদন্তে বাদ পড়েছিল। বিদেশি সংস্থার হস্তক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে, যদিও পূর্ববর্তী সরকার এসব অস্বীকার করেছিল।
জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ. ল. ম. ফজলুর রহমান বলেছেন, তদন্ত কাজ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পেশাদারি মান বজায় রেখে করা হয়েছে। তবে ১৬ বছর আগের ঘটনায় বহু আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সংশ্লিষ্টরা বিদেশে চলে গেছেন। তিনি বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের কয়েকটি কারণ ছিল। বিডিআরের মধ্যে অসন্তোষ এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ ছিল। কিছু সদস্য সেনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সহমত ছিল না। এ ছাড়া সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চাওয়াও ঘটনার পেছনে একটি কারণ।
জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য, দীর্ঘ পাঁচ দশকেও আমরা শক্ত মাটিতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারিনি। আমাদের বন্ধু ও শত্রুকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারিনি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, স্বাধীনতার সূর্য্য অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে উদিত হয়। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআরের বিদ্রোহ নাটক মঞ্চস্থ করে দেশের সার্বভৌমত্বের উপর চরম আঘাত হানে। ওইদিন কেন্দ্রীয় সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার ফলে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৬ বছরেও পিলখানা হত্যার প্রকৃত রহস্য জাতীয়ভাবে উদঘাটিত হয়নি। দুটি তদন্ত কমিটি গঠন হলেও পুরো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। তাই ২৫ ফেব্রুয়ারি এখনও সঠিকভাবে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোও জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ। জাতির স্বার্থে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তকরণ এবং বিচারের মাধ্যমে উদ্ভূত ইতিহাস স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি।
পিলখানা হত্যার বিচার দীর্ঘসূত্রিতা ও ধীরগতির কারণে এখনও অসম্পূর্ণ। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন, সম্ভব হলে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কার্যকরী বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের আত্মার শান্তি এবং জাতির আস্থা পুনঃস্থাপনই প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
জাতি হিসাবে আমাদের দায়িত্ব, ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। মুক্তিযুদ্ধ এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে নতুন সরকারের নেতৃত্বে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পিলখানা ট্রাজেডি শুধুমাত্র একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চরম আঘাত।
লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক,ইমেইল: [email protected]