চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের হালিশহরে ‘হালিমা মঞ্জিল’ নামে ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলায় বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন এবং একই পরিবারের নয়জন গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন। তবে একদিন পেরিয়ে গেলেও বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
ঘটনা মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঘটে। বিস্ফোরণের পরে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। দগ্ধদের স্থানীয়রা উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে তাদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন:
নুরজাহান বেগম রানি, যিনি সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে কুমিল্লায় মারা যান।
তার ছেলে সাফায়াত হোসেন শাওন, যিনি মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় মারা যান।
পর্তুগাল প্রবাসী সামির আহমেদ, যিনি মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় মৃত্যুবরণ করেন।
দগ্ধদের মধ্যে রয়েছেন গৃহকর্তা শাখাওয়াত হোসেন, তার মেয়ে উম্মে আয়মন সানজিদা (৮), শাখাওয়াতের ভাই সামির আহমেদের স্ত্রী পাখি আক্তার (৩৫), ছেলে ফারহান আহমেদ আনাছ (৮) ও মেয়ে আয়েশা (৪), এবং শাখাওয়াতের আরেক ভাই মো. শিপন হোসাইন (২৫)। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (কেজিডিসিএল) গ্যাস সংযোগ থেকে লিকেজ ঘটতে পারে। তবে লিফট, এসি, আইপিএস, হাই ভোল্টেজ বা ভবনের অন্যান্য বৈদ্যুতিক ও কেমিক্যাল উপকরণ থেকেও বিস্ফোরণ হতে পারে বলে নানা সম্ভাবনা তদন্ত কমিটি যাচাই করছে।
ফায়ার সার্ভিস ও কেজিডিসিএল পৃথকভাবে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক রশিদ উদ্দিন জানান, ঢাকা থেকে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা ঘটনা স্থল পরিদর্শন করে বিস্ফোরণের কারণ উদঘাটনের পাশাপাশি ভবনের নকশা, অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যাচাই করবে। কেজিডিসিএলের তিন সদস্যের কমিটি তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে।
ছয়তলা ভবনের নিচ তলাটি পার্কিং ও মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উপরের তলায় ২০টি বাসা রয়েছে। বিস্ফোরণের আঘাতে তৃতীয় তলার ওই বাসার সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। পাশের সেহেলি ভবনের ১৮টি জানালার কাচ ভেঙে গেছে এবং অন্য পাশের ভবনের জানালার কাচও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাচের ভাঙা টুকরো রাস্তার অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
ভবনের দারোয়ান মো. সম্রাট বলেন, ভোরের অগ্নিকাণ্ডে তিনি মাত্র সেহরি খেয়ে পানির বোতল হাতে নিচে ছিলেন। বিকট শব্দে প্রথমে তিনি ভূমিকম্প মনে করেছিলেন। পরে উপরে গিয়ে দেখেন বাসা লন্ডভন্ড। তিনি ফটক খুলে সবাইকে নিরাপদে বের হতে সাহায্য করেন।
পাশের ভবনের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, দীর্ঘদিন ধরে লিফট ও হাই ভোল্টেজে সমস্যা ছিল। তারা আশা করছেন, তদন্তে সব বিষয় স্পষ্টভাবে উদঘাটন হবে। ফায়ার সার্ভিস এবং কেজিডিসিএলের তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের মতে, ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, অনুমোদনহীন গ্যাস সংযোগ ও বৈদ্যুতিক দুর্বলতা মিলিতভাবে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। প্রশাসন বলছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে ভবন ও গ্যাস সংযোগের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি