আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের ওপর সম্ভাব্য ইসরায়েলি বা যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং শীর্ষ নেতাদের গুপ্তহত্যার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী লারিজানি। জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় বিশেষ ক্ষমতা অর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
নিউইয়র্ক টাইমস এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনির অনুপস্থিতি বা অক্ষমতার পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানিকে। একই তথ্য উল্লেখ করেছে মিডলইস্ট আই। খামেনি নিজেই এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য নেতৃত্ব শূন্যতা বা চেইন অব কমান্ডে বিঘ্ন এড়াতে চার স্তরের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ সামরিক ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কেউ নিহত হলে পর্যায়ক্রমে কারা দায়িত্ব নেবেন, তা আগেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও নিজেদের সম্ভাব্য চারজন উত্তরসূরির নাম প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননের হাসান নাসরুল্লাহ ও হামাসের ইসমাইল হানিয়াহ–এর মতো মিত্র নেতাদের ওপর সফল গুপ্তহত্যার ঘটনা তেহরানকে সতর্ক করেছে। ইরানি গোয়েন্দা মূল্যায়নে আশঙ্কা করা হচ্ছে, শত্রুপক্ষ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব বা সামরিক কমান্ড কাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখা এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতেই এই আগাম সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
যদিও আলী লারিজানি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে নেই—কারণ এ পদের জন্য জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেম হওয়া বাধ্যতামূলক—তবুও চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার উপযুক্তদের একজন হিসেবে বিবেচিত। গত আগস্টে তাকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়। এই কাউন্সিল ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত কৌশলগত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কও তীব্র অবস্থায় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে সামরিক হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার কথাও বলছেন। বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ ও বহুসংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। তবে সম্ভাব্য সংঘাতে ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত লক্ষ্য—সীমিত সামরিক আঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস, নাকি বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তন—তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির এই পদক্ষেপে দুটি বার্তা স্পষ্ট। প্রথমত, নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও ইরানের নীতি ও প্রতিরোধ সক্ষমতা দুর্বল হবে না। দ্বিতীয়ত, শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করলেও রাষ্ট্রযন্ত্র অচল করা যাবে না—এ বার্তাই শত্রুপক্ষকে দিতে চায় তেহরান।
গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনব্যাপী সংঘাতের সময় খামেনি সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই উত্তরাধিকার পরিকল্পনাকে আরও সুসংগঠিত করা হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব, ইরানের এই নতুন সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
৮৬ বছর বয়সী খামেনির এই ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ইঙ্গিত দিচ্ছে—যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে তেহরান। সম্ভাব্য সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—যে কোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।