আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার জবাবে তেহরান আঞ্চলিক পর্যায়ে পাল্টা আঘাত জোরদার করেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) প্রতিশোধের ঘোষণা দিয়ে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ইতিহাসের “সবচেয়ে ভারী” হামলার দাবি করে।
ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামিও দেশ রক্ষায় অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। সেনাবাহিনী জানায়, তাদের যুদ্ধবিমান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান তার সামরিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। তখন ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেও অধিকাংশই প্রতিহত হয়। কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিতে হামলাও আগাম সতর্কবার্তার পর চালানো হয়েছিল, যা মূলত প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
ইরানের সামরিক কাঠামো
ইরানের সামরিক কাঠামো জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘আরতেশ’ মূলত ভৌগোলিক সুরক্ষা ও প্রচলিত যুদ্ধ পরিচালনা করে। অপরদিকে আইআরজিসি শুধু প্রতিরক্ষা নয়, রাজনৈতিক কাঠামো রক্ষার দায়িত্বও পালন করে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করে। এই দ্বৈত কাঠামো সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীন, যা অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থানসহ বহিঃশত্রুর হুমকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক পাল্টা হামলা
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার পর ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে শাহেদ ড্রোন ও উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯টি ড্রোন ছোড়ার দাবি করে তেহরান। আবুধাবি বিমানবন্দরে এক ব্যক্তি নিহত ও সাতজন আহত হন। দুবাই ও কুয়েতের বিমানবন্দরেও হামলার খবর পাওয়া যায়।
রবিবার ইসরায়েলের বেইত শেমেশ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত নয়জন নিহত ও ২০ জনের বেশি আহত হন।
নতুন সামরিক কৌশল
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান কৌশল হলো—তীব্র চাপের মুখেও টিকে থাকা, মূল সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং নিয়ন্ত্রিত অসম যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃস্থাপন। ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সুরক্ষায় ‘মিসাইল সিটি’ অবকাঠামো শক্তিশালী করা, কমান্ড কাঠামো ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রথম দফার ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে দ্বিতীয় দফার আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় রাখাই এর অংশ।
এছাড়া আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে চাপ বাড়ানো, ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে রাখা এবং প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার কৌশলও বিবেচনায় রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।
২০২৫ সালের যুদ্ধের তুলনায় পরিবর্তন
২০২৫ সালের জুনে যুদ্ধ শুরু হয় ইসরায়েলের ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে। পরে যুক্তরাষ্ট্রও নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহান স্থাপনায় বাঙ্কার-বাস্টার হামলা চালায়। যদিও তখন একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়, এবার ইরান তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
তবে অবকাঠামোগত ক্ষতি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ইরানের সক্ষমতাকে সীমিত করছে। তাই পূর্ণমাত্রার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বদলে বিরতি-সহ আঘাত হানার কৌশলেই এগোতে পারে তেহরান।
কৌশল কতটা কার্যকর?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনো তাৎপর্যপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে সক্ষম, যা প্রতিপক্ষকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষায় বাধ্য করছে। তবে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং খামেনির মৃত্যু শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে।
সংঘাত কতদিন?
সামরিকভাবে ইরান দীর্ঘদিন ছিটেফোঁটা হামলা চালিয়ে যেতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমাত্রার যুদ্ধ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে থাকলেও আন্তর্জাতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ জনমত ও কূটনৈতিক ব্যয় তাদের জন্য সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না গিয়ে সীমিত ও প্রতিরোধমূলক অভিযানেই মনোযোগ দেবে। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান এবং ইরানের পরবর্তী নেতৃত্বের কৌশলের ওপর।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি