ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল এবং এর জবাবে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে—এমন নিশ্চিত তথ্যই ট্রাম্প প্রশাসনকে আগাম হামলা চালাতে বাধ্য করেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ওয়াশিংটনের আকস্মিকভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে এটাই নতুন ব্যাখ্যা।
বিমান হামলা শুরুর নির্দেশ দেওয়ার পর সোমবার সন্ধ্যায় কংগ্রেস সদস্যদের প্রথম ব্রিফিং দেওয়া হয়। ক্যাপিটলে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রুবিওর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন।
চলতি সপ্তাহে হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসে একটি ‘ওয়ার পাওয়ারস’ প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা রয়েছে, যা পাস হলে প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে, যদিও এর সম্ভাবনা ক্ষীণ।
রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, “এটা একেবারেই স্পষ্ট ছিল যে, ইরান যদি কারও—যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা অন্য কারও হামলার শিকার হয়, তারা জবাব দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকেই লক্ষ্য করবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা জানতাম ইসরায়েলি পদক্ষেপ আসছে। জানতাম, তাতে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা হবে। তাই তারা হামলা চালানোর আগেই আমরা আগাম আঘাত না হানলে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হতো।”
সোমবার রাতে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ইরান ও বিশ্বকে পরিষ্কার বার্তা দিতে চান—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি থামবেন না।”
সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ছয়জন সেনা সদস্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে, আর ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ইরানে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট। রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিলেও ডেমোক্র্যাটরা একে অপ্রয়োজনীয় ও লক্ষ্যহীন সংঘাত বলে সমালোচনা করছেন। সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার ব্রিফিংয়ের আগে বলেন, “এটি ট্রাম্পের যুদ্ধ। এটি পছন্দের যুদ্ধ। তার কোনো কৌশল নেই, কোনো শেষ লক্ষ্য নেই।”
বৈঠক শেষে তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা ‘সম্পূর্ণভাবে অপর্যাপ্ত’ এবং এতে জবাব পাওয়ার চেয়ে প্রশ্নই বেশি তৈরি হয়েছে। সিনেট গোয়েন্দা কমিটির ডেমোক্র্যাট ভাইস-চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নার বলেন, ইসরায়েলের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যত নতুন যুদ্ধে টেনে নিচ্ছে, এতে তিনি উদ্বিগ্ন। তার ভাষায়, “ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না। ইসরায়েলের জন্য হুমকি ছিল। যদি আমরা ইসরায়েলের প্রতি হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করি, তবে আমরা অজানা পথে পা রাখছি।”
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফক্স নিউজকে বলেন, ইরান এমন ভূগর্ভস্থ স্থাপনা তৈরি করছিল, যা কয়েক মাসের মধ্যে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে অপ্রবেশযোগ্য করে তুলত। “এখন পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যেত না,” বলেন তিনি। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলেছেন। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও নৌবাহিনী ধ্বংস, পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের মিত্রগোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা—এসবই তার উল্লেখিত লক্ষ্য। তবে রুবিও সাংবাদিকদের কাছে কেবল দুটি লক্ষ্যই বলেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা।
হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসে স্পিকার মাইক জনসন প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপকে ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’ বলে সমর্থন করেন। তার ভাষায়, “প্রেসিডেন্টের কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে এই কাজ শেষ করার ক্ষমতা এখন কেড়ে নেওয়ার চিন্তাই বিপজ্জনক।”
ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই হামলার নির্দেশ দেন, যদিও রুবিও জানান, হামলা শুরুর আগে ‘গ্যাং অব এইট’ নামে পরিচিত কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের একটি দলকে অবহিত করা হয়েছিল। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসে শিগগিরই যে ‘ওয়ার পাওয়ারস’ প্রস্তাবটি উঠছে, তা পাস হলেও প্রেসিডেন্ট ভেটো দিতে পারেন; ভেটো অতিক্রম করতে কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন, যা বর্তমানে কঠিন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সূত্র: গার্ডিয়ান
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব