আশিস গুপ্ত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলমান উত্তেজনা গত শনিবার এক নতুন ও ভয়াবহ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা শুরু করে। এই অভিযানের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার সংঘাত এখন প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ নিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা একটি আট মিনিটের ভিডিওতে নিশ্চিত করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামক একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে।
এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হিসেবে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া। পেন্টাগনের তথ্যমতে, শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে এ পর্যন্ত ইরানের ১,২৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে যে তারা ইরানের ১১টি জাহাজ ধ্বংস করেছে।
এই অভিযানে বিমান হামলা, সমুদ্র থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সমন্বিত আক্রমণ চালানো হয়। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথম দফার এই হামলায় তেহরানে অবস্থিত নিজ বাসভবনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সোমবার ট্রাম্প এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত এই অভিযান স্থায়ী হতে পারে। অন্যদিকে, ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে যে দেশের ১৩০টি স্থানে চালানো হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৫৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে বর্তমানে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের প্রভিডেন্স শহরে অবস্থিত ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ২০২৫ সালের ‘কস্টস অব ওয়ার’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে।
এর বাইরে ইয়েমেন ও ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ইসরায়েলের সমর্থনে মার্কিন অভিযানে খরচ হয়েছে আরও প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার। ফলে এই সংঘাত-সংশ্লিষ্ট মোট মার্কিন ব্যয় ইতিমধ্যে ৩৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স’-এর অধীনে ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পটি পরিচালিত হয়।
অপারেশন এপিক ফিউরিতে যুক্তরাষ্ট্র বিমান, নৌ ও স্থলপথের ২০টিরও বেশি উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে বি-১ ও বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান, এফ-৩৫ ও এফ-২২-এর মতো আধুনিক ফাইটার জেট এবং প্রথমবারের মতো যুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়া ‘লুকাস’ ড্রোন, যা মূলত ইরানি নকশা থেকে তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া টমাহক ক্রুজ মিসাইল এবং প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এই অভিযানে সক্রিয় রয়েছে। স্টিমসন সেন্টারের বিশেষজ্ঞদের মতে, পেন্টাগন সঠিক তথ্য প্রকাশ না করলেও অনুমান করা হচ্ছে যে অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
এ ছাড়া যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করতেই খরচ হয়েছে আরও ৬৩০ মিলিয়ন ডলার। একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনা করতে প্রতিদিন প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে এমন দুটি গ্রুপ মোতায়েন রয়েছে।
আর্থিক ব্যয়ের চেয়েও বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্ত্রের মজুত বা ইনভেন্টরি। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার, যা এই যুদ্ধের খরচ বহনে সক্ষম, কিন্তু প্যাট্রিয়ট বা এসএম-৬-এর মতো ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুদ সীমিত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করার এই উচ্চ হার অনির্দিষ্টকাল ধরে বজায় রাখা সম্ভব নয়, কারণ এসব জটিল প্রযুক্তির অস্ত্র রাতারাতি তৈরি করা যায় না। তাছাড়া এই অস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশ ইউক্রেন বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
ফলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মার্কিন কমান্ডের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে যত দ্রুত সম্ভব স্থবির করে দেওয়া, যাতে তারা আর বড় ধরনের কোনো পাল্টা আঘাত হানতে না পারে। তবে এই অভিযান শেষ পর্যন্ত কতদিন চলবে এবং এর চূড়ান্ত আর্থিক ও মানবিক মূল্য কত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’ (Operation Roaring Lion) এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা এক জটিল সমীকরণের সম্মুখীন। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া বহুমুখী যুদ্ধের পর ২০২৬ সালের এই পর্যায়ে এসে ইসরায়েলের সামরিক শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা উভয়ই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।
চলমান এই সামরিক সংঘাতে ইসরায়েলের কৌশলগত সক্ষমতা মূলত তাদের উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর বিমানবাহিনী এবং বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের ‘অ্যারো-৩’ এবং ‘ডেভিডস স্লিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুদ বজায় রাখা। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মজুদে টান পড়ার গুঞ্জন উঠেছিল, যা বর্তমানে আরও প্রকট হয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েল এখন তাদের নতুন লেজারভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন বিম’ ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে, যা প্রথাগত মিসাইলের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং দ্রুত ব্যবহারযোগ্য। কৌশলগতভাবে ইসরায়েল এখন কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নেই; বরং মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের অভ্যন্তরে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ও পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনে তাদের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে গোড়াতেই ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করেছে।
ইসরায়েলের নতুন ‘আয়রন বিম’ (Iron Beam) প্রযুক্তি মূলত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজারভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এটি ‘রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস’ এবং ‘এলবিট সিস্টেমস’-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি ১০০ কিলোওয়াট শ্রেণির হাই-এনার্জি লেজার সিস্টেম।
প্রথাগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন ‘আয়রন ডোম’-এ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে ‘তামির’ নামক ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি শটের খরচ প্রায় ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ ডলার। এর বিপরীতে ‘আয়রন বিম’ লেজারের মাধ্যমে কাজ করে বলে প্রতিবার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে খরচ হয় মাত্র ২ থেকে ৫ ডলারের মতো।
এই নগণ্য ব্যয়ের কারণে একে যুদ্ধের ‘অর্থনৈতিক গেম-চেঞ্জার’ বলা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে চলমান ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’-এ প্রথমবারের মতো এই ব্যবস্থাটি পুরোদমে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ড্রোন ও রকেটের মতো ছোট আকারের লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
প্রযুক্তিগতভাবে ‘আয়রন বিম’ আলোর গতিতে কাজ করে। রাডার কোনো হুমকি শনাক্ত করার পর তাৎক্ষণিকভাবে সেটি ধ্বংস করা সম্ভব হয়। এর কোনো প্রচলিত গোলাবারুদ নেই; যতক্ষণ বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকবে, ততক্ষণ এটি টানা আক্রমণ চালাতে সক্ষম।
তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। খুব মেঘলা আকাশ, কুয়াশা বা বৃষ্টির মতো প্রতিকূল আবহাওয়ায় লেজার রশ্মির কার্যকারিতা কিছুটা কমে যায়। তাই ইসরায়েল এটিকে স্বতন্ত্র ব্যবস্থার পরিবর্তে তাদের মাল্টি-লেয়ার্ড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করছে।
বর্তমানে ইসরায়েল এই প্রযুক্তির কয়েকটি সংস্করণ তৈরি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে চলন্ত যান বা ট্রাকে বসানোর উপযোগী ‘আয়রন বিম এম’ এবং জাহাজে মোতায়েনযোগ্য সংস্করণ। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে আইডিএফ-এর সব বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তির বিকাশে যুক্তরাষ্ট্রও উল্লেখযোগ্যভাবে ১.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করেছে। ফলে এটি এখন কেবল ইসরায়েলের নয়, বরং আধুনিক পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও অন্যতম প্রধান সম্পদে পরিণত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে ইসরায়েল বর্তমানে একটি দ্বিমুখী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে দেশটির শক্তিশালী হাই-টেক শিল্প ও প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা যুদ্ধের অর্থনীতিকে সচল রাখছে, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বিশাল ব্যয়ভার জাতীয় বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে।
মার্কিন সরাসরি আর্থিক ও সামরিক সমর্থন দেশটিকে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করছে। তবে যুদ্ধের কারণে বিপুলসংখ্যক রিজার্ভ সৈন্যকে কর্মক্ষেত্র থেকে সরিয়ে সামরিক কাজে নিয়োজিত রাখায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে ইসরায়েলের কৌশল এখন আর্থিক ব্যয়ের চেয়ে সামরিক লক্ষ্য অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ও মার্কিন রাজনৈতিক সমর্থনের ধারাবাহিকতার ওপর।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি