আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি প্রতিনিধি :
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় ওয়াকফ বিষয়ক অশান্তি নিয়ে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চরমে উঠেছে। সাম্প্রতিক এই সহিংসতার ঘটনায় রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। উক্ত প্রতিবেদনে তিনি লিখেছেন, মুর্শিদাবাদে সংঘটিত সহিংসতা পূর্বপরিকল্পিত এবং স্থানীয় প্রশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতার ফল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে শোষণ চালানোর প্রবণতা এই অশান্তির মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে।
রাজ্যপালের মতে, সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে প্রশাসনের অব্যাহত ব্যর্থতা চলতে থাকলে কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত ভারতের সংবিধান অনুযায়ী উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন সংবিধানের ৩৫৬ ধারার প্রয়োগ বিবেচনার বিষয়টি, যা ভারতীয় রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন (President's Rule) জারির সাংবিধানিক ভিত্তি প্রদান করে। ভারতের সংবিধানের ৩৫৬ ধারার অধীনে যদি কোনও রাজ্যে সাংবিধানিক শাসন ব্যাহত হয় বলে কেন্দ্র মনে করে, তবে রাষ্ট্রপতির আদেশে ওই রাজ্যে নির্বাচিত সরকার বাতিল করে সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসন চালু করা যায়। এই ধারা সাধারণত প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতির মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
রাজ্যপাল তাঁর প্রতিবেদনে মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলার মতো বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্থায়ীভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের সুপারিশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে চোরাগোপ্তা জঙ্গি অনুপ্রবেশের আশঙ্কা বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক দাঙ্গার পেছনেও এই ধরনের কার্যকলাপ থাকতে পারে। ফলে অতিরিক্ত বিএসএফ ক্যাম্প স্থাপন ও কেন্দ্রীয় নজরদারি বৃদ্ধি এখন অপরিহার্য।
তবে রাজ্যপালের এই প্রতিবেদনকে ঘিরে রাজ্যে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ একে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” এবং “পলিটিক্যাল অ্যাসাইনমেন্ট পালনের অংশ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজ্যপাল জানেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এবং সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব মূলত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা বিএসএফ-এর। সেই দায় এড়িয়ে রাজ্য প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের চেষ্টা করছেন রাজ্যপাল। কুণাল ঘোষ আরও বলেন, রাজ্যপালের উচিত ছিল বিএসএফ-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা, কারণ সীমান্ত দিয়ে যদি কেউ ঢোকে, সেটার দায়ভার রাজ্যের নয়।
এই প্রতিবেদন ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এক নতুন উত্তেজনাকর মোড় নিয়েছে। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের মাঝে সাংবিধানিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থানের দ্বন্দ্ব আবারও প্রকট হয়ে উঠছে। মুর্শিদাবাদের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক প্রশ্ন এখন শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়, বরং তা কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা এবং রাজ্য শাসনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব