চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে মাঠ থেকে ব্যাপক হারে ফসল উঠতে শুরু করায় চট্টগ্রামের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আড়তগুলোতে এখন পেঁয়াজে ভরপুর অবস্থা দেখা যাচ্ছে। সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম কমলেও খুচরা বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সরেজমিনে খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের বিভিন্ন আড়ত ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি আড়তেই দেশি পেঁয়াজের বড় বড় মজুত রয়েছে। আড়তে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী আড়তের বাইরেও পেঁয়াজ রেখে বিক্রি করছেন। কোথাও কোথাও আবার ট্রাক থেকে সরাসরি পাইকারি ক্রেতাদের কাছে পেঁয়াজ সরবরাহ করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে আসা পেঁয়াজের প্রায় শতভাগই দেশি। পাবনা, রাজবাড়ি, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর ও মেহেরপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ বাজারে আসছে।
পাইকারি বাজারে জাত, মান ও আকারভেদে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে। কিন্তু একই পেঁয়াজ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে। ফলে পাইকারি ও খুচরা দামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
চাক্তাইয়ের আড়তদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স বশর অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আবুল বশর বলেন, বর্তমানে বাজারে ভারতীয় কোনো পেঁয়াজ নেই; সবই দেশি পেঁয়াজ। ভালো মানের বড় সাইজের দেশি হালি পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রমজানের শুরুতে এ দামের চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল।
তিনি আরও বলেন, দেশি হালি পেঁয়াজ এখন মানের দিক থেকে ভারতীয় পেঁয়াজকেও টেক্কা দিচ্ছে। দেশে উৎপাদন আরও বাড়ানো গেলে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। এজন্য সরকারকে পেঁয়াজ চাষিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া উচিত।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স জামেনা ট্রেডিংয়ের পরিচালক মো. আজগর হোসেন জানান, বর্তমানে বাজারে দেশি হালি ও মুড়িকাটা—দুই ধরনের পেঁয়াজই প্রচুর এসেছে। মেহেরপুরি মুড়িকাটা পেঁয়াজ কেজি প্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর হালি পেঁয়াজ আকারভেদে ২৮ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হামিদউল্লা মিয়া বাজারের মেসার্স আল মুনিরীয়া ট্রেডার্সের ম্যানেজার মো. রবিউল বলেন, আড়তে এখন পেঁয়াজের সরবরাহ এত বেশি যে অনেক ব্যবসায়ী জায়গার অভাবে ট্রাক থেকেই সরাসরি বিক্রি করছেন। বাজারে বিভিন্ন আকার ও মানের পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। বড় সাইজের হালি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আবার ছোট আকারের পেঁয়াজ ১৮ থেকে ২০ টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের লামার বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, পাবনা, রাজবাড়ি ও কুষ্টিয়ায় পেঁয়াজের ভালো ফলন হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। বর্তমানে যে দামে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে, তাতে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ভোক্তারাও আগের তুলনায় কম দামে পেঁয়াজ কিনতে পারছেন।
তবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, খুচরা বিক্রেতারা অতিরিক্ত লাভ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে মুদি দোকান ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি লাভ করছেন। খাতুনগঞ্জের ফুটপাতে পাইকারি থেকে কিনে খুচরা বিক্রি করা কিছু বিক্রেতার কাছে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৩০ টাকা এবং হালি পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে। নগরীর বিভিন্ন মুদি দোকানেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ৫ মার্চের বাজার প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরীর খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মাস আগেও একই পেঁয়াজের দাম ছিল ৪৫ থেকে ৮০ টাকা কেজি।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে দাম কমার সুফল পুরোপুরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, অনেক ব্যবসায়ীর মধ্যে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা রয়েছে। পেঁয়াজের মৌসুমে বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও খুচরা দোকানে বেশি লাভ করা হচ্ছে, ফলে ভোক্তারা ন্যায্য সুবিধা পাচ্ছেন না।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের উচিত নিয়মিত বাজার মনিটরিং জোরদার করা এবং পাইকারি ও খুচরা দামের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। তবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)–এর হিসাবে দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টন। যদিও দেশে উৎপাদন অনেক সময় চাহিদার চেয়ে বেশি হয়, কিন্তু সঠিক সংরক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বাড়তি উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছরই চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের অপচয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও কমে আসবে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি