ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন এসেছে। নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ বাহিদি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শুক্রবার (৬ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা হামলায় নিহত হন। নিহতদের মধ্যে আইআরজিসির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ পাকপুরও ছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি হামলার শিকার হয়ে নিহত হন।
এর আগে আইআরজিসির নেতৃত্বে ছিলেন হুসেইন সালামি। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘর্ষ চলাকালে তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে বাহিনীটি একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব হারিয়েছে।
আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারদের ওপর হামলার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। সংস্থাটির কুদস ফোর্সের দীর্ঘদিনের প্রধান কাসেম সোলাইমানি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন। ওই হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘটনাটি তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর গঠিত আইআরজিসির শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন আহমদ বাহিদি। ১৯৮০-এর দশকে তিনি সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি আইআরজিসির কুদস ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে এই বাহিনীর দায়িত্ব পান কাসেম সোলাইমানি।
যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাকে আইআরজিসির উপপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। যুদ্ধের প্রথম দিনের হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বাহিদি প্রকাশ্যেই ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ রক্ষার অঙ্গীকার করেছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসলামী বিপ্লবকে রক্ষা করা বিশ্বের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
আহমদ বাহিদি শুধু সামরিক কর্মকর্তা হিসেবেই নন, রাজনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সরকারের সময় তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন।
পরে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও প্রশাসনিক—দুই ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা থাকায় সংকটময় পরিস্থিতিতে আইআরজিসির নেতৃত্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তবে বাহিদির ক্যারিয়ার বিতর্কমুক্ত নয়। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে এএমআইএ ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ওই হামলায় ৮৫ জন নিহত হন। এ ঘটনায় ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছিল।
এ ছাড়া ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় আহমদ বাহিদির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুদ্ধে ইরানের অনেক অভিজ্ঞ সামরিক নেতা নিহত হওয়ায় আইআরজিসিকে নতুন করে সংগঠিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমানে অনেক সামরিক ইউনিট প্রায় স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছে। ফলে কেন্দ্রীয় সমন্বয় বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে আইআরজিসির বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করে যুদ্ধ পরিচালনা করাই হবে আহমদ বাহিদির প্রধান দায়িত্ব। কারণ ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক স্থিতিশীলতার বড় অংশই নির্ভর করছে এই বাহিনীর সক্ষমতার ওপর।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম