আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ছাত্রী। হামলার দায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের শুরুর দিনেই এই হামলার ঘটনা ঘটে।
সেদিন স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ১০টা ৪৫ মিনিটে ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরে অবস্থিত শাজারেহ তায়্যেবে মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। বিস্ফোরণে দুইতলা ভবনটি ধসে পড়ে এবং ভেতরে থাকা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনেকেই চাপা পড়ে নিহত হন। এতে অন্তত ১৭০ জন নিহত এবং আরও বহু মানুষ আহত হন।
বিদ্যালয়টি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ হরমোজগান প্রদেশে অবস্থিত, যা হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি এবং সেখানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) নৌঘাঁটি রয়েছে।
হামলার পরপরই ইরান এ ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে বলেন, এই হামলায় নিরীহ শিশুদের হত্যা করা হয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধের জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই হামলাকে ‘স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ’ বলে উল্লেখ করেন এবং বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনার আহ্বান জানান।
তিনি আরও দাবি করেন, এটি ছিল ‘ডাবল-ট্যাপ’ হামলা অর্থাৎ একই স্থানে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি আঘাত, যাতে উদ্ধারকাজে আসা মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাস্থলের ভিডিও ও ফুটেজে দেখা গেছে হামলাটি সম্ভবত একটি মার্কিন টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চালানো হয়েছিল।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, লক্ষ্য নির্ধারণে ভুলের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় স্কুলটি আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। কারণ বিদ্যালয়টির পাশেই আইআরজিসি নৌবাহিনীর কিছু স্থাপনা রয়েছে এবং অতীতে ওই স্থানটি সামরিক স্থাপনার অংশ ছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’র উপদেষ্টা ও সাবেক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, লক্ষ্যবস্তুর তথ্য হালনাগাদ না থাকায় এমন ভুল হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমদিকে দাবি করেন, হামলাটি ইরান নিজেরাই ঘটিয়ে থাকতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্তাধীন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে মার্কিন সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে একটি মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য নির্ধারণে ভুলের কারণে বিদ্যালয়ে আঘাত হানতে পারে।
ইসরায়েল এ ঘটনায় সম্পূর্ণভাবে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্রনাদভ শোশানি বলেন, ঘটনাটির সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের প্রায় সব ডেমোক্র্যাট সদস্য তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক চিঠিতে জানতে চেয়েছেন—এই হামলায় মার্কিন বাহিনী জড়িত ছিল কি না এবং বেসামরিক প্রাণহানি রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের সময় ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঘটনা নতুন নয়। ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়ায় ন্যাটোর বোমা হামলায় ভুলবশত চীনা দূতাবাসে আঘাত লাগে এবং তিন সাংবাদিক নিহত হন।
এর আগে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে বাগদাদের আমিরিয়াহ বাঙ্কারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৪০০-র বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, মিনাবের স্কুলে হামলার তদন্ত এখনও চলমান। তবে যদি যুক্তরাষ্ট্রের দায় প্রমাণিত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি