রিপোর্টার্স২৪ডেস্ক:দেশে জ্বালানি তেলের প্রকৃত ঘাটতি না থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতিগত ত্রুটির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক সংকট তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে এবং এতে নতুন সরকারকে বিব্রত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) রাজধানীর ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। তবে জরুরি পরিস্থিতির জন্য অতিরিক্ত তেল সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত স্টোরেজ সুবিধা নেই। অনেক তেলবাহী জাহাজ ডিপোর সামনে অপেক্ষা করলেও ধারণক্ষমতা প্রায় পূর্ণ থাকায় সেগুলো থেকে তেল খালাস করা যাচ্ছে না। তাই সরবরাহ ঘাটতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় বেশি জ্বালানি কিনতে শুরু করে। এতে বাজারে হঠাৎ চাপ তৈরি হয়। তবে সংকটের মূল কারণ গুজব নয়; বরং পরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি বিপণন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই কঠোর বিপণন নীতিমালা আরোপ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ৮ মার্চ থেকে বিপিসি প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের জন্য কোটা নির্ধারণ করে এবং আগের গড় উত্তোলনের ভিত্তিতে প্রায় ২৫ শতাংশ কম সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেয়। সংগঠনটির দাবি, কাগজে ২৫ শতাংশ কম দেখালেও বাস্তবে সরবরাহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেছে। কারণ পাম্পে নিয়মিত সরবরাহের পাশাপাশি এজেন্ট ও প্যাক পয়েন্টে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ হতো, তাও কমে গেছে। সব মিলিয়ে বাজারে প্রায় ৪৫ শতাংশ কম তেল আসছে।
সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, বিপিসি মার্চ থেকে জুন সময়কালের গড় উত্তোলনের ভিত্তিতে বর্তমান সরবরাহ নির্ধারণ করেছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাধারণত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল সময়কালে সেচ মৌসুমের কারণে জ্বালানির চাহিদা বেশি থাকে এবং মার্চের পর থেকে তা কমতে শুরু করে। ফলে মার্চ-জুনের গড় ধরে সরবরাহ নির্ধারণ করায় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে নীতির অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পেট্রোল পাম্পগুলো সাধারণত সপ্তাহে সর্বোচ্চ পাঁচ দিন এবং মাসে ২০ থেকে ২২ দিন জ্বালানি উত্তোলন করে। কিন্তু বিপিসি মাসকে ৩০ দিন ধরে দৈনিক কোটা নির্ধারণ করায় সরবরাহ বাস্তবে আরও কমে গেছে।
এছাড়া বিপিসি ডিপোভিত্তিক দৈনিক সরবরাহসীমাও নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে ডিপোতে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বিপণন কোম্পানিগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছে না। সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে চাহিদা ওঠানামা করলেও দৈনিক সীমা থাকায় বিশেষ করে রোববার ও বৃহস্পতিবার বেশি চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করা হয়।
সংগঠনটির নেতারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে পাম্পগুলোর বরাদ্দ এত কম যে ৫ হাজার থেকে ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষম ট্যাংক লরি পূর্ণ লোডে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আংশিক লোডে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় ডিলারদের কমিশনের চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে, ফলে অনেক পাম্পের জন্য তেল উত্তোলন বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়েছে।
তাদের মতে, এসব নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সারাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃত্রিম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। অনেক পাম্পে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে তেল উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। এতে বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ লাইন, ভোগান্তি ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও পাম্পকর্মীদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা জানান।
সংগঠনটি দাবি জানিয়েছে, ডিপোভিত্তিক দৈনিক কোটা ব্যবস্থা অবিলম্বে শিথিল বা প্রত্যাহার করে সাপ্তাহিক কোটা পদ্ধতি চালু করতে হবে। এতে চাহিদার ওঠানামা অনুযায়ী সরবরাহ সমন্বয় করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের জয়েন্ট কনভেনর মিজানুর রহমান রতন, আবু হিরণ, সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ, সদস্য এসএম আবদুল মুকিত, জিয়া উদ্দিন ও সাজ্জাতুল আমিনসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি