রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন এক নতুন ধরনের হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি হলেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় এগুলো অত্যন্ত কার্যকর ও প্রাণঘাতী, যা প্রতিরোধ করা কঠিন করে তুলেছে।
ব্রিটেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক থমাস উইথিংটন জানিয়েছেন, এই ড্রোনগুলো আক্রমণের আগে অল্প সময়ের জন্য জিপিএস ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করে। এরপর জিপিএস সংযোগ বন্ধ করে ‘ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম’ (জড়গত ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা)-এর মাধ্যমে গন্তব্যে পৌঁছায়। ফলে জ্যামিং বা সিগন্যাল ব্লক করলেও ড্রোনের গতিপথ পুরোপুরি ব্যাহত করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগে ড্রোনগুলো আবারও জিপিএস চালু করতে পারে, তবে সব সময় তা প্রয়োজন হয় না। এই কৌশল জ্যামিং প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শাহেদ ধাঁচের ড্রোন তৈরি করছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি-এর তথ্য অনুযায়ী, এসব ড্রোনে উন্নতমানের অ্যান্টেনা ইন্টারফারেন্স সাপ্রেশন প্রযুক্তি রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের জ্যামিং সিগন্যালকে ছেঁকে ফেলে প্রয়োজনীয় জিপিএস সিগন্যাল সচল রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ড্রোনগুলো হালকা প্লাস্টিক ও ফাইবারগ্লাস দিয়ে তৈরি হওয়ায় রাডারে সহজে ধরা পড়ে না। পাশাপাশি ছোট আকার ও নিচু উচ্চতায় ওড়ার ক্ষমতা থাকায় এগুলোকে শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইরান একাধিক নেভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। এর মধ্যে চীনের ‘বেইদো’ এবং রাশিয়ার ‘গ্লোনাস’ সিস্টেম উল্লেখযোগ্য। ফলে একটি সিস্টেম অকার্যকর হলেও অন্যটি দিয়ে ড্রোন চালনা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরান পুরনো রেডিও নেভিগেশন প্রযুক্তি ‘লোরান’ পুনরায় চালুর চেষ্টা করছে। যদিও এটি বর্তমানে সক্রিয় কি না, তা নিশ্চিত নয়।
প্রতিরোধে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা: শাহেদ ড্রোন মোকাবিলায় প্রচলিতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র, কামান ও ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল লেজার প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।
তবে ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা বলছে, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার- বিশেষ করে জ্যামিং ও ‘স্পুফিং’- কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্পুফিংয়ের মাধ্যমে ড্রোনের নেভিগেশন সিস্টেমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এর গন্তব্য পরিবর্তন করা সম্ভব।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে ইউক্রেন প্রায় ৪ হাজার ৬৫২টি ড্রোন ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের মাধ্যমে অকেজো করেছে, যা একই সময়ে গুলি করে নামানো ড্রোনের সংখ্যার কাছাকাছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ড্রোন মোকাবিলায় একক কোনো পদ্ধতি যথেষ্ট নয়; বরং ইলেকট্রনিক ও প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহারই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
তবে ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা বলছে, জ্যামিং এবং ‘স্পুফিং’ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। ড্রোনের নেভিগেশন সিস্টেমে হ্যাক করে তার গন্তব্য বদলে দেওয়াকে স্ফুপিং ব্যবস্থা বলা হয়।
ইউক্রেনের সামরিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এএফপি দেখেছে, গত বছরের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ৪ হাজার ৬৫২টি ড্রোন ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের মাধ্যমে অকেজো করেছে; যা একই সময়ে গুলি করে নামানো ৬ হাজার ৪১টি ড্রোনের সংখ্যার কাছাকাছি।
ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, এসব ড্রোনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইলেকট্রনিক এবং প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায়ই যৌথভাবে ব্যবহার করা হয়।
সূত্র: এএফপি।
রিপোর্টার্স২৪/আরকে