আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি: বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ভারতের শেয়ারবাজারে এক ভয়াবহ ধসের সাক্ষী থাকল বিনিয়োগকারীরা। সেনসেক্স ২,৫০০ পয়েন্টের বেশি পড়ে যাওয়ায় বাজারে রীতিমতো হাহাকার পড়ে যায়। বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এইচডিএফসি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংকটে বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
দিনের শেষে সেনসেক্স ২৪৯৬.৮৯ পয়েন্ট বা ৩.২৬ শতাংশ কমে ৭৪,২০৭.২৪ পয়েন্টে এবং নিফটি ৭৭৫.৬৫ পয়েন্ট পড়ে ২৩,০০২.১৫ পয়েন্টে থিতু হয়েছে। গত মাসে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই শেয়ার বাজারের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। এই ব্যাপক বিক্রির ঝোঁকে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১৪ লক্ষ কোটি টাকা এক লপ্তে উবে গিয়েছে।
বাজারের এই পতনের পেছনে বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু কারণ একসাথে কাজ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের আবহে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি কেন্দ্রে ইসরায়েলের হামলার খবর তেলের বাজারকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের বড় অংশ আমদানি করে বলে তেলের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং টাকার দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা কর্পোরেট মুনাফাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর পাশাপাশি মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় বিশ্ব বাজারের পরিস্থিতিও প্রতিকূল ছিল। ব্যাংকিং খাতের শেয়ারগুলিতে এদিন সবচেয়ে বেশি পতন লক্ষ্য করা গেছে, যার নেতৃত্বে ছিল এইচডিএফসি ব্যাংক।
ব্যাংকটির খণ্ডকালীন চেয়ারম্যান অতনু চক্রবর্তী পদত্যাগ করার পর এইচডিএফসি-র শেয়ার ৫ শতাংশের বেশি পড়ে প্রায় ৮০০ টাকায় নেমে আসে। অতনু চক্রবর্তী তাঁর পদত্যাগপত্রে ব্যাংকের ভেতরে এমন কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন যা তাঁর ব্যক্তিগত আদর্শ ও নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
এইচডিএফসি-র পাশাপাশি অ্যাক্সিস ব্যাংক, আইসিআইসিআই ব্যাংক এবং স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার শেয়ারেও এদিন লাল সংকেত দেখা গেছে। ধস নেমেছে অন্যান্য ক্ষেত্রেও। লারসেন অ্যান্ড টুব্রো ৩ শতাংশের বেশি পড়ে গিয়েছে। বাজাজ ফাইন্যান্স এবং শ্রীরাম ফাইন্যান্সের মতো শেয়ারগুলিতেও বড় পতন দেখা গেছে।
বিশ্ববাজারের দুর্বল সংকেতে ইনফোসিস, টিসিএস এবং উইপ্রোর মতো তথ্যপ্রযুক্তি শেয়ারগুলিও চাপের মুখে ছিল। জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কায় ইন্ডিগোর মতো বিমান পরিষেবা সংস্থার শেয়ার ৩ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। এমনকি আইটিসি এবং হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের মতো রক্ষণাত্মক শেয়ারগুলির দামও কমেছে। তবে জ্বালানির দাম বাড়ার ইতিবাচক প্রভাবে কোল ইন্ডিয়ার শেয়ার কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের লাগাতার শেয়ার বিক্রির ফলে টাকার দাম সর্বকালীন তলানিতে ঠেকেছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় বাজারে এই সর্বাত্মক বিক্রির হিড়িক পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে বাজার অত্যন্ত অস্থির থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যদি প্রশমিত না হয় এবং তেলের দাম যদি চড়া থাকে, তবে বাজারের ওপর এই চাপ বজায় থাকবে। তবে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাজার পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব