আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ২১তম দিনে এসে ইরান যুদ্ধ আরও জটিল ও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, আঞ্চলিক ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এবং সম্ভাব্য স্থল অভিযানের ইঙ্গিত সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।
ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালানোর পর তেহরান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় আবার হামলা হলে তারা “শূন্য সংযম” নীতি অনুসরণ করবে। এর পরপরই ইরান ইসরায়েলের হাইফা ও তেল আবিবসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায়। একই সঙ্গে কাতারের রাস লাফান শিল্প শহরেও আঘাত হানা হয়।
ইরানের দাবি, এখনো তারা তাদের সামরিক শক্তির অল্প অংশ ব্যবহার করেছে। দেশটির মানবিক পরিস্থিতিও ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ১,৪০০ মানুষ নিহত এবং ১৮ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২০০-এর বেশি শিশু রয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত-এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে বাহরাইন ইতোমধ্যে বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইছির সঙ্গে বৈঠকে ১৯৪১ সালের পার্ল হারবার আক্রমণ প্রসঙ্গ টেনে ‘অপ্রত্যাশিত হামলা’র কৌশলকে সমর্থন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তাদের সামরিক লক্ষ্য অপরিবর্তিত রয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস, সামরিক শিল্প দুর্বল করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ করা। তবে আপাতত স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, “ইরান দুর্বল হয়ে পড়ছে” এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, শুধু আকাশ হামলা দিয়ে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়—যুদ্ধে স্থল অভিযানও যুক্ত হতে পারে।
লেবাননেও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর একাধিক হামলার দাবি করেছে। দেশটিতে ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হয়েছেন। ব্যাপক সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। কাতারের গ্যাস স্থাপনায় হামলার ফলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে এটি ঝুঁকির মুখে পড়ায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে গ্যাসের দাম বেড়েছে, এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ হরমুজ প্রণালী নিরাপদ রাখতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জ্বালানি ও পানিসম্পদ স্থাপনায় হামলা বন্ধে জরুরি আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি