আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার পাল্টা হুমকি দিয়েছে উভয় পক্ষ। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তা না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে বলে হুমকি দেন তিনি। যুদ্ধ শুরুর প্রায় চার সপ্তাহ পর এই হুমকি পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।
এর জবাবে রোববার ইরান সতর্ক করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের জ্বালানি ও জ্বালানি-সম্পর্কিত অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা, বিশেষ করে জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও পানি লবণমুক্তকরণ অবকাঠামো, লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংঘাতের জেরে জ্বালানির দাম বেড়েছে, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে। আইজি মার্কেটসের বিশ্লেষক টনি সাইকামোরের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই আল্টিমেটাম বাজারে এক ধরনের ‘টাইম বোমা’ তৈরি করেছে। যদি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তাহলে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় পতন এবং তেলের দামে তীব্র উল্লম্ফন দেখা যেতে পারে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বে সরবরাহ হওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার জেরে প্রণালীটির কার্যক্রম কার্যত বিঘ্নিত হয়েছে, যা ১৯৭০-এর দশকের পর সবচেয়ে বড় তেল সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। গত সপ্তাহে ইউরোপে গ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থায় ইরানের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী সব জাহাজের জন্য বন্ধ নয়; কেবল ইরানের ‘শত্রু’ দেশগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নিরাপত্তা সমন্বয় করে অনেক জাহাজ এখনো ওই পথ ব্যবহার করতে পারছে বলে জানা গেছে।
এদিকে যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে ইরান প্রথমবারের মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান Eyal Zamir জানান, ইরান ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটির দিকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার পাল্লার দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এই পাল্লার মধ্যে ইউরোপের বেশ কয়েকটি রাজধানী শহরও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা তেহরানের বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ন্যাটো জোটের অনেক দেশ হরমুজ প্রণালী খুলতে সামরিক অভিযানে সরাসরি জড়াতে অনীহা প্রকাশ করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে মতভেদ বাড়ছে। রয়টার্স-ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, ৫৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই হামলার বিরোধিতা করেছেন, আর ৩৭ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছেন। সামনে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে এই যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি