আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি: সুইজারল্যান্ডের বায়ুমান প্রযুক্তি সংস্থা ‘আইকিউএয়ার’ প্রকাশিত ২০২৫ সালের বিশ্ব বায়ুমান প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম ২.৫ দূষণের মাত্রার নিরিখে ভারত বিশ্বের ষষ্ঠতম দূষিত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতের বাতাসে পিএম ২.৫-এর গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৪৮.৯ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমা ৫ মাইক্রোগ্রামের চেয়ে প্রায় দশ গুণ বেশি।
যদিও ২০২৪ সালের তুলনায় দূষণের মাত্রা সামান্য হ্রাস পেয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞরা একে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য বলে মানছেন না; বরং আবহাওয়াগত পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে দেখছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর এবং রাজধানী—উভয় তালিকাতেই ভারতের নাম শীর্ষে রয়েছে। উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ জেলার লোনি শহরটি ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে দূষণের মাত্রা হু-র নির্দেশিকার চেয়ে ২২ গুণেরও বেশি। অন্যদিকে, ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লি টানা কয়েক বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত রাজধানীর তকমা ধরে রেখেছে।
২০২৫ সালে গড় পিএম ২.৫ মাত্রার ভিত্তিতে পাকিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশ। সেই বছর দেশটিতে জনসংখ্যা-ভিত্তিক পিএম ২.৫-এর গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৭.৩ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই তালিকায় ভারতের আগে রয়েছে যথাক্রমে বাংলাদেশ (৬৬.১ মাইক্রোগ্রাম), তাজিকিস্তান (৫৭.৩ মাইক্রোগ্রাম), চাদ (৫৩.৬ মাইক্রোগ্রাম) এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (৫০.২ মাইক্রোগ্রাম)।
প্রতিবেদন অনুসারে, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত অঞ্চল এবং বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দূষিত শহরের মধ্যে ১৭টিই এই অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতের লোনি ছাড়াও মেঘালয়ের বার্নিহাট, দিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরনগর বিশ্বের শীর্ষ দশ দূষিত শহরের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
ভারতে এই ভয়াবহ বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পজাত নির্গমন, ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং নির্মাণকাজের ধুলোবালিকে। বিশেষ করে শীতকালে উত্তর ভারতজুড়ে ধোঁয়াশার দাপট এবং গ্রীষ্মে ধূলিঝড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দিল্লির দূষণে দেখা গেছে যে, এপ্রিল মাসে ধূলিঝড়ের কারণে এবং ডিসেম্বর মাসে শীতকালীন পরিস্থিতির প্রভাবে দূষণের মাত্রা হু হু করে বেড়ে যায়।
যদিও ভারতজুড়ে বায়ুমান পর্যবেক্ষণের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে, কিন্তু দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এই প্রতিবেদন। জাতীয় নির্মল বায়ু কর্মসূচির অধীনে ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে দূষণ ৪০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থাৎ ৬৪ শতাংশ খরচ করা হচ্ছে কেবল রাস্তার ধুলো কমাতে। বায়োমাস বা ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো বন্ধ কিংবা যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে তুলনায় অনেক কম অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
এছাড়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে সালফার নির্গমন নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি না করা এবং পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের ছাড়পত্র দেওয়া বায়ুদূষণকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, কেবল একটি শহরভিত্তিক পরিকল্পনা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বিশেষ করে সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার বৈদ্যুতিকরণই ভারতের বাতাসকে বিষমুক্ত করার একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি পথ।
রিপোর্টার্স২৪/সাইফ