আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কৌশলগত সামুদ্রিক পথগুলোকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী অবরোধকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কৌশল হিসেবে দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ ছাড়াও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ভবিষ্যতে বড় শক্তিগুলোর সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
প্রণালী বলতে মূলত দুটি সাগরের সংযোগকারী সরু জলপথকে বোঝায়, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস জুড়েই এসব পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত হয়েছে, যা আধুনিক সময়েও অব্যাহত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী: জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন
পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরকে সংযুক্ত করা হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোর একটি। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং ভারত, চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাব এল-মান্দেব: বিকল্প রুটেও ঝুঁকি
বাব এল-মান্দেব প্রণালী লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজের বিকল্প হিসেবে এই পথ ব্যবহার করতে চাইলেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতায় এটিও ঝুঁকির মুখে। এছাড়া সোমালীয় জলদস্যুতাও এখানে একটি বড় উদ্বেগ।
সুয়েজ খাল: এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের কেন্দ্র
সুয়েজ খাল এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। তবে এই খাল ব্যবহার করতে হলে বাব এল-মান্দেব প্রণালী অতিক্রম করতে হয়, ফলে ওই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা সুয়েজকেও ঝুঁকিতে ফেলছে।
মালাক্কা প্রণালী: চীনের অর্থনীতির ‘জীবনরেখা’
মালাক্কা প্রণালী ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্যে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। চীনের প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য এবং ৮০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে ভবিষ্যতে উত্তেজনা বাড়তে পারে।
পক প্রণালী: ভারত-শ্রীলঙ্কা উত্তেজনা
পক প্রণালী ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। কচ্চতীবু দ্বীপকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি জটিল হলে এটি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
জিব্রাল্টার ও বেরিং প্রণালী: পুরনো ও নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতা
জিব্রাল্টার প্রণালী নিয়ে যুক্তরাজ্য ও স্পেনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে বেরিং প্রণালী—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সীমান্ত—ভবিষ্যতে নতুন উত্তেজনার কেন্দ্র হতে পারে, বিশেষ করে বরফ গলে যাওয়ায় এ পথে নৌচলাচল বাড়ার প্রেক্ষাপটে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য এসব প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে যেকোনো একটি পথ অচল হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এসব সামুদ্রিক ‘চোক পয়েন্ট’ ঘিরে ভবিষ্যতে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে। সূত্র: আনন্দবাজার
রিপোর্টার্স২৪/এসসি