স্পোর্টস ডেস্ক: নানা প্রতিকূলতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দীর্ঘ ভ্রমণের বাধা পেরিয়ে অবশেষে ৪০ বছর পর আবারও ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে ইরাক। আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’রা।
ম্যাচ শেষে ইরাক দলের খেলোয়াড়দের আবেগঘন উদযাপন ছিল চোখে পড়ার মতো। গোলরক্ষক আহমেদ বাসিল মাঠে লুটিয়ে পড়েন, আর কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডকে কাঁধে তুলে উল্লাসে মেতে ওঠেন সতীর্থরা। একই সময়ে রাজধানী বাগদাদ, বসরা, মসুল ও এরবিলসহ দেশের বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে উদযাপন করেন এই ঐতিহাসিক সাফল্য।
ম্যাচে ইরাকের হয়ে গোল করেন আলি ইব্রাহিম আল-হামাদি ও আয়মান হুসেইন। তাদের এই জয়ে শেষ হয় দীর্ঘ ৮৬৭ দিনের বাছাইপর্বের যাত্রা, যা ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম কঠিন অভিযাত্রা।
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে পুরো অঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দলের কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড ও খেলোয়াড়রা বিভিন্ন দেশে আটকে পড়েন। কেউ ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে, কেউবা ইরাকেই। এমনকি ভিসা জটিলতার কারণে অনেকেই সময়মতো যাত্রা করতে পারেননি।
এক পর্যায়ে ইরাক দলের প্লে-অফ ম্যাচ স্থগিত করার আবেদন জানানো হলেও তা নাকচ করে ফিফা। পরে জর্ডানের আম্মানে গিয়ে দলটি জড়ো হয় এবং সেখান থেকে প্রায় ২০ ঘণ্টার বিমানযাত্রা শেষে ম্যাচ ভেন্যুতে পৌঁছায়। পুরো যাত্রা সম্পন্ন করতে সময় লাগে তিন দিনেরও বেশি।
এদিকে দলে ছিল ইনজুরি সমস্যা এবং ম্যাচ ফিটনেসের ঘাটতি। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক জালাল হাসান ও ডিফেন্ডার আহমেদ ইয়াহিয়া চোটের কারণে দলে ছিলেন না। এছাড়া কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় দীর্ঘদিন ম্যাচের বাইরে ছিলেন। তবুও সব বাধা পেরিয়ে জয় ছিনিয়ে আনে ইরাক।
এই সাফল্যের পেছনে কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই কোচ কঠিন পরিস্থিতিতে দলকে একত্রিত করে ‘আমরাই বিশ্ববিরোধী’ মানসিকতা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এর আগে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বকাপে তোলার অভিজ্ঞতা থাকায় তিনিই এখন প্রথম কোচ হিসেবে দুইটি ভিন্ন দেশকে বিশ্বকাপে নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করতে যাচ্ছেন।
আর্নল্ড বলেন, এই দলের আবেগ অসাধারণ। তারা দেশের জন্য খেলতে চায়, দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে চায়। এই জয় তাদের সেই স্বপ্নের প্রতিফলন।
২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘আই’-তে ইরাকের প্রতিপক্ষ হবে ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করলেও যোগ্যতা অর্জনের এই অবিশ্বাস্য যাত্রা ইরাককে নতুন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসা ইরাকের জন্য এটি শুধু একটি ক্রীড়াসাফল্য নয়, বরং যুদ্ধ-বিধ্বস্ত একটি দেশের জন্য ঐক্য, আশা ও গৌরবের প্রতীক হয়ে উঠেছে।