আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে স্বস্তি ফিরালেও কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্ভাব্য কোনো চুক্তিতে ইরানকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিলে তা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল) রাতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাধ্যমে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত সাময়িকভাবে থেমে যায়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে না দিলে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার জবাবে ইরান এই পথের চলাচল প্রায় স্থবির করে দেয়।
যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল পুনরায় চালুর কথা বলা হলেও, ইরান জানিয়েছে,এই সময়ের মধ্যে চলাচল তাদের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে হবে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)-এর সদস্য দেশগুলো যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি ও স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত রাখার ওপর জোর দিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করতে গিয়ে ইরানকে এই জলপথে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি দুর্বল হলেও ইরান এই প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বজায় রাখে, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলো স্থায়ী চাপের মধ্যে পড়বে এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের ঝুঁকি তৈরি হবে।
যুদ্ধবিরতির পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ অবস্থায় বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব তোলে, যাতে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের অনুমোদন চাওয়া হয়। তবে রাশিয়া ও চীন ওই প্রস্তাবে ভেটো দেয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবুশাহাব বলেন, কোনো একক দেশের হাতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা উচিত নয়।
এদিকে, ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে টোল আরোপের প্রস্তাবও বিবেচনা করছেন বলে জানান। যদিও হোয়াইট হাউস পরে জানায়, তাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা ছাড়াই প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, পর্যটন ও আর্থিক খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তাই তারা কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি আগ্রাসী অবস্থান অব্যাহত রাখে, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে।
অন্যদিকে, আসন্ন আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে থাকছে। যদিও ইরান সীমিত আলোচনায় রাজি, তবে পুরো কর্মসূচি বন্ধে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে। ফলে স্থায়ী সমাধান এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি