আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লেবাননে নতুন করে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিকে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। বৃহস্পতিবারের এসব হামলায় অন্তত ২৫০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে, যা চলমান সংঘাতে প্রতিবেশী দেশটিতে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিকে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা সামনে রেখে ইসলামাবাদ শহরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর বিলাসবহুল সেরেনা হোটেল ঘিরে তিন কিলোমিটার এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা অবস্থান করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হোটেলটি “গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজনের” জন্য খালি করে দেওয়া হয়েছে।
তবে এখনো হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি তেহরান। ইরান জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে কোনো চুক্তিই কার্যকর হবে না। যুদ্ধবিরতির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মাত্র একটি তেলবাহী ট্যাংকার ও পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করেছে;যেখানে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় ১৪০টি জাহাজ চলাচল করে।
লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে না বলে জানিয়েছে ইসরায়েল ও ওয়াশিংটন। তবে ইরান ও পাকিস্তান, যারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, বলেছে, লেবাননও এই চুক্তির অংশ। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশও যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানিয়েছেন, লেবানন এবং ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই যুদ্ধবিরতি তাদের অন্তর্ভুক্ত করতেই হবে। পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, লেবানন ও ইয়েমেন উভয় ক্ষেত্রেই যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা হবে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের ভাতিজাকে হত্যা করেছে এবং দক্ষিণ লেবাননে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। রাজধানী বেইরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। শহরের উপকণ্ঠে বসবাসরত বাসিন্দাদের দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা অন্তত ২০টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে এবং লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি যানবাহন লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পাশাপাশি উত্তর ইসরায়েলেও রকেট নিক্ষেপ করেছে।
বুধবারের হামলাকে “গণহত্যা” হিসেবে আখ্যা দিয়ে লেবানন সরকার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মৃত ও আহতদের খুঁজে বের করতে রাতভর অভিযান চালিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সদস্য জিভ এলকিন জানিয়েছেন, শান্তি আলোচনা চলাকালেও লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকবে, তবে কিছুটা সীমিত আকারে।
ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিলেও অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তেলের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকটে ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু পরিশোধনাগার ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলার দামে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের খুচরা মূল্যও গ্যালনপ্রতি ৫.৬৯ ডলারে পৌঁছেছে।
ইরানে যুদ্ধবিরতিকে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ৪০ দিন পূর্তিতে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে শোক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত লক্ষ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমানো এখনো অর্জন করতে পারেনি। ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে।
চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও ছাড় দাবি করছে, যার মধ্যে রয়েছে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চায়, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করুক, ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুক এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করুক।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি