স্বপন বিশ্বাস
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার হোসনেয়ারার ভাইরাল অডিও সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। একটি অডিও কখনও কখনও শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ থাকে না; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বহু অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করে। এই ঘটনাও তেমনই এক বহুমাত্রিক বার্তা বহন করছে।
প্রথমত, এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—নারী আজ প্রশাসনের উচ্চপদে, নেতৃত্বে, মাঠ প্রশাসনে, বিচার ব্যবস্থায় কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছালেও নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা তার পিছু ছাড়েনি। কর্মস্থলের ক্ষমতার বলয়, প্রভাবশালী সম্পর্ক এবং প্রশাসনিক নির্ভরতার কারণে অনেক নারী নীরব থাকতে বাধ্য হন। পদ মর্যাদা সবসময় আত্মরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে যে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে সমাজে উচ্চারিত, এই আলোচনায় তারও প্রতিফলন দেখা যায়। স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কাগুজে বরাদ্দ, অদৃশ্য কাজ, অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রশাসনিক যোগসাজশ—এসব অভিযোগ নতুন নয়। জনপ্রতিনিধি একা নয়, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া বড় ধরনের অনিয়ম দীর্ঘস্থায়ী হওয়া কঠিন—এই উপলব্ধিও মানুষের মধ্যে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
তৃতীয়ত, জেলা প্রশাসন থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ক্ষমতার একটি অভ্যন্তরীণ কাঠামো রয়েছে, যেখানে নৈতিকতার চেয়ে প্রভাব অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। অভিযোগ উঠলে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বদলি বা দায়িত্ব পরিবর্তন দ্রুত দেখা গেলেও মূল প্রশ্ন থাকে—জবাবদিহি কোথায়? অভিযোগের গভীরে গিয়ে সত্য অনুসন্ধানের সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালী?
চতুর্থত, রাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রশাসনিক বলয়ের মধ্যে নারীরা অনেক সময় দ্বৈত চাপে থাকেন—একদিকে দায়িত্বের চাপ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার অদৃশ্য সংগ্রাম। অনেক ঘটনা প্রকাশ পায় না শুধু সামাজিক ব্যাখ্যার ভয়ে। কারণ অভিযোগকারীকেই অনেক সময় কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়।
পঞ্চমত, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে—শিক্ষা কি কেবল পদ লাভের উপকরণ, নাকি আত্মসচেতনতা ও নৈতিক শক্তিরও ভিত্তি? উচ্চশিক্ষা মানুষকে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা দেয় না; তাকে ন্যায়-অন্যায়ের অবস্থান বোঝার শক্তিও দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, সনদ আছে, অথচ নৈতিক সাহস অনুপস্থিত।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পদ কোনো আনুষ্ঠানিক মর্যাদার প্রতীক মাত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থানীয় প্রশাসনিক চালিকাশক্তি। আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা, ভূমি প্রশাসন—সবক্ষেত্রেই একজন ইউএনওকে দিনরাত সক্রিয় থাকতে হয়। ফলে এই পদে থাকা ব্যক্তির ব্যক্তিগত দৃঢ়তা, প্রশাসনিক সততা ও নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ষষ্ঠত, অভিযোগ প্রকাশের পর যদি কেবল অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে থাকা পক্ষ প্রশাসনিক পরিবর্তনের মুখে পড়ে, অথচ প্রভাবশালী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না আসে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।আমাদের সমাজে নারীকে বারবার নারী পরিচয়ে বিচার করা হয়; অথচ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে একজন কর্মকর্তা প্রথমত কর্মকর্তা, তারপরে নারী বা পুরুষ। প্রয়োজন নারীর খোলস ভেঙে মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা—আত্মমর্যাদা, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং ন্যায়বোধের জায়গা থেকে।
শিক্ষা মুখস্থ বিদ্যার সীমা ছাড়িয়ে যদি আত্মসচেতনতা তৈরি না করে, তবে সেই শিক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক সনদে সীমাবদ্ধ থাকে। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে ভীত নয়, বিবেকবান করে
পরিশেষে প্রত্যাশা একটাই—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, সত্য প্রকাশিত হোক, এবং ব্যক্তি-প্রভাব নয়, অপরাধের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত হোক
লেখক: কবি ও কলামিস্ট