ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি কার্গো জাহাজ জব্দ করার পর তেহরান পাল্টা প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং আপাতত নতুন শান্তি আলোচনায় না বসার ঘোষণা দিয়েছে। এতে করে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ওয়াশিংটন আন্তরিক নয়। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে ইরান কোনো সময়সীমা বা চাপে বিশ্বাস করে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির দুই সপ্তাহ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পাকিস্তানে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে চাইলেও ইরান তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র অবাস্তব ও অযৌক্তিক শর্তে অনড় অবস্থান নিয়েছে।
রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে। একই সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিসহ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কোনো আলোচনার বিষয় নয় বলে স্পষ্ট করা হয়েছে।
পাকিস্তানের এক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, দেশটির মধ্যস্থতাকারী ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, এই অবরোধই আলোচনার প্রধান বাধা। ট্রাম্প এ বিষয়ে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
রোববার ছয় ঘণ্টার অচলাবস্থার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজে গুলি চালিয়ে এর ইঞ্জিন অচল করে দেয় এবং পরে মেরিন সদস্যরা হেলিকপ্টার থেকে নেমে জাহাজটিতে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি অবরোধ ভেঙে ইরানের বন্দর আব্বাসের দিকে যাচ্ছিল।
ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, জাহাজটি চীন থেকে আসছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে তারা “সশস্ত্র দস্যুতা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, এ ধরনের “স্পষ্ট আগ্রাসন”-এর জবাব দিতে তারা প্রস্তুত, তবে জাহাজে নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
চীনও এই জাহাজ আটকানোর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পারস্য উপসাগর দিয়ে বিশ্বে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরল গ্যাস সরবরাহ হয়ে থাকে, যা বর্তমানে কার্যত বিঘ্নিত।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে তাদের তেল রপ্তানি সীমিত করছে, অন্যদিকে অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছে—যা গ্রহণযোগ্য নয়। দেশটির প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদরেজা আরেফ বলেছেন, “সবাইয়ের জন্য উন্মুক্ত তেল বাজার নিশ্চিত করতে হবে, না হলে সবাইকে বড় মূল্য দিতে হবে।”
এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান তার শর্ত না মানলে দেশটির সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া হবে। পাল্টা জবাবে ইরান জানিয়েছে, তাদের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা হলে তারা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি লবণমুক্তকরণ স্থাপনায় আঘাত হানবে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা থাকলেও তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে রাজধানীজুড়ে প্রায় ২০ হাজার নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে সম্ভাব্য আলোচনার প্রস্তুতি নিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও পারমাণবিক ইস্যু ও প্রণালী নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
আট সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। গত মার্চে ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন কমে যায়।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং পাল্টা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। একই সময়ে লেবাননেও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলছে, যেখানে আপাতত একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি