ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: যুক্তরাজ্যের অন্তত ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর নজরদারি চালাতে সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পরিচালিত একটি বেসরকারি সংস্থাকে অর্থ দিয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে এক যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
আল জাজিরা ইংলিশ এবং লিবার্টি ইনভেস্টিগেটস- এর অনুসন্ধানে জানা যায়, হোরাস সিকিউরিটি কনসালটেন্সি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ, ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই এবং গোপন ‘সন্ত্রাসবাদ ঝুঁকি মূল্যায়ন’ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সংস্থাটিকে অন্তত ৪ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ দিয়েছে। নজরদারির আওতায় ছিলেন ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ফিলিস্তিনি অতিথি বক্তা এবং লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স-এর এক পিএইচডি শিক্ষার্থী, যিনি গাজা সমর্থনে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের অক্টোবরে নির্দিষ্ট কিছু ছাত্র সংগঠনের তালিকা সংস্থাটিকে দেয়, যাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি চালাতে বলা হয়। তালিকায় ফিলিস্তিনপন্থী ও প্রাণী অধিকারকর্মী সংগঠনও ছিল।
এই নজরদারির আওতায় থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, কিংস কলেজ লন্ডন, শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়, লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং কার্ডিফ মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়।
যদিও এই কার্যক্রম অবৈধ এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে এটি নিয়ে মানবাধিকার ও গোপনীয়তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগ বাড়ছে।
সংস্থাটি ‘ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স’ পদ্ধতিতে অনলাইনে উন্মুক্ত তথ্য সংগ্রহ করে এবং ২০২২ সাল থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছে। তাদের ‘ইনসাইট’ সেবা মাসিক প্রায় ৯০০ পাউন্ডের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরবরাহ করা হয়।
জাতিসংঘের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক জিনা রোমেরোএ বিষয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার “গভীর আইনি উদ্বেগ” তৈরি করে। তার মতে, এতে শিক্ষার্থীদের বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য এমন সংস্থার হাতে যাচ্ছে, যেগুলোর ওপর জনসাধারণের তদারকি নেই।
যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম শিক্ষক সংগঠন ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জো গ্রেডি এই ঘটনাকে “লজ্জাজনক” বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, “নিজেদের শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারিতে লাখ লাখ পাউন্ড ব্যয় করা অনৈতিক।”
নজরদারির শিকার এক পিএইচডি শিক্ষার্থী জানান, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে—যা তাকে বিস্মিত করেছে। তিনি বলেন, “আমরা জানতাম কিছু নজরদারি হচ্ছে, কিন্তু এত সংগঠিতভাবে হচ্ছে তা ভাবিনি।”
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাবি করেছে, এই তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া। তারা বলছে, সব তথ্যই উন্মুক্ত উৎস থেকে নেওয়া হয়েছে এবং ব্যক্তিগত তথ্য সরাসরি শেয়ার করা হয়নি।
তবে সমালোচকদের মতে, এই ধরনের নজরদারি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি